যুদ্ধের মধ্যেও ঘর ছাড়তে নারাজ ইয়েমেনের বাসিন্দারা

ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোচা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরও হাজারো বেসামরিক মানুষ সেখানে রয়ে গেছেন। যুদ্ধ, গোলাবর্ষণ, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও তাদের অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে পারছেন না। কেউ অর্থের অভাবে, কেউ পরিবারের অসুস্থ বা অক্ষম সদস্যদের কারণে, আবার কেউ নিজের ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় থেকে গেছেন।

মোচার উত্তরে ইয়াখতুল গ্রামের চল্লিশোর্ধ্ব দিনমজুর নাবিলও তাদের একজন। আত্মীয়স্বজন নিয়ে এখনও সেখানেই বসবাস করছেন তিনি। নাবিলের ভাষায়, বাস্তুচ্যুত হওয়া মানে অপমান ও গৃহহীনতা। তিনি বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি, তাই ভয় পাওয়ারও কিছু নেই এবং তিনি কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত নন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একজন ফুয়াদ জানান, সরকার পুরোনো আল-বারহ সড়ক খুলে দেওয়ায় কেউ কেউ বের হতে পেরেছেন। তবে কেউ হুথিদের বাধার মুখে পড়েছেন, আবার কেউ বাস্তুচ্যুত হওয়ার দুর্ভোগের আশঙ্কায় ঘরেই থেকে গেছেন।

গত ১০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের পক্ষ থেকে মোচা ও আশপাশের এলাকাকে ‘কিল বক্স’ বা সামরিক হামলার অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেখানে হুথিদের যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী সামরিক শক্তি ব্যবহারের সতর্কতা দেওয়া হয়। পরদিন থেকেই হামলা শুরু হয়। মোচা দখলের পর অনেক বাসিন্দা শহর ছাড়তে চাইলেও সবার পক্ষে তা সম্ভব হয়নি।

শহরে রাতের কারফিউ জারি রয়েছে বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটও ঘন ঘন হচ্ছে। নাবিলের ভাষ্য অনুযায়ী, রান্নার গ্যাসের একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে প্রায় ২০ হাজার ইয়েমেনি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে। ৫০ কেজি আটার বস্তার দামও আগের তুলনায় প্রায় ৮ হাজার রিয়াল বেড়েছে। দিনমজুর নাবিল বলেন, এক দিনের আয় দিয়ে এখন জ্বালানি ও দুপুরের খাবারের খরচ মেটানোই কঠিন। অনেক শিশুও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছে।

যুদ্ধের ভয়ে ফাঁকা স্কুল
মোচার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মানসুর বলেন, শ্রেণিকক্ষগুলো অনেকটাই ফাঁকা। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা গোলাবর্ষণের ভয় পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ছেলেদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে ষাটোর্ধ্ব উম্ম খালেদের জন্য মোচা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগই নেই। তার স্বামী প্রতিবন্ধী ও শয্যাশায়ী। তার ছেলে আগে মাছ ধরে পরিবারের জীবিকা চালাতেন এবং সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সে যোগ দিয়েছিলেন। হুথিরা অগ্রসর হওয়ার সময় তিনি পরিবারের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান।

চিকিৎসাব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে
যুদ্ধের প্রভাবে মোচার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। হুথি বাহিনী শহরে প্রবেশের দিন মেডিসিনস সানস ফ্রঁতিয়ের বা এমএসএফ জানায়, মোচা জেনারেল হাসপাতাল ছাড়া প্রায় সব স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল। মূলত স্বাস্থ্যকর্মীদের পালিয়ে যাওয়াই এর বড় কারণ ছিল। তবে প্রায় ৩০ জন স্বাস্থ্যকর্মী তখনও থেকে গিয়েছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। চিকিৎসকদের বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। কিছু হাসপাতাল নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রাখা হয়েছে এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম রাজধানী সানায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও বাসিন্দারা জানিয়েছেন। এসব দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

হামলায় একই পরিবারের ছয়জন নিহত 
মোচায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। ২২ সেপ্টেম্বর ভোরের আগে একটি বাড়িতে বোমা হামলায় একই পরিবারের ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সাংবাদিক মাহমুদ আল-ওতুমি জানিয়েছেন। হুথি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ওই হামলার জন্য সৌদি বিমান হামলাকে দায়ী করেছে। সৌদি আরব এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। ইয়েমেনি সরকারের সামরিক কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, ‘কিল বক্স’ ঘোষণা করা হয়েছে হুথি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে, বেসামরিক নাগরিকদের জন্য নয়। তবে মোচা জেলার সরকার-নিযুক্ত কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বলেছেন, শহর থেকে বের হওয়ার কোনো পথই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোচা
মোচা বন্দরটি বাব আল-মান্দাব প্রণালির প্রায় ৭৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের এই প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুথিদের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পর মোচা দখল করে তারা উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করেছে।

২০১৭ সালে সরকারপন্থী বাহিনী মোচা পুনর্দখলের পর শহরটি হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইয়েমেনিদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। এবার সেই শহরই আবার সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে মোচায় থেকে যাওয়া নাবিলের মতো মানুষের কাছে যুদ্ধের রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে নিজের ঘর ও জীবিকা রক্ষা করাই বড়। অর্থের সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং ঘরবাড়ি লুট হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেও তিনি এলাকা ছাড়তে চান না। নাবিলের ভাষায়, অর্থই প্রথম বাধা। তার ওপর তিনি ভয় পান, চলে গেলে তার বাড়িটি লুট হয়ে যেতে পারে। তাই যুদ্ধের ঝুঁকি সত্ত্বেও মোচাতেই থেকে যাওয়াকে তিনি নিজের জন্য তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে দেখছেন।