হুথিদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযানের ঘোষণা ইয়েমেন সরকারের

ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের কবল থেকে দেশের সমস্ত অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি আরব সমর্থিত সরকার।

রোববার (৪ অক্টোবর) এক টেলিভিশন ভাষণে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমী ঘোষণা দেন যে, “সন্ত্রাসী মিলিশিয়ার হাত থেকে দেশ সম্পূর্ণ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত” সরকারি সশস্ত্র বাহিনী এই আক্রমণ চালিয়ে যাবে। এরপর এক সামরিক মুখপাত্র হুথি যোদ্ধাদের অবিলম্বে অস্ত্র সমর্পণ করার আহ্বান জানান।

আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসার আল্লাহ’ নামে পরিচিত হুথি বিদ্রোহীরা ২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানাসহ উত্তর-পশ্চিমের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এর আগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের চালানো ধারাবাহিক আক্রমণ প্রতিহত করার পাশাপাশি ইরানের সহায়তায় তারা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও অস্ত্রশস্ত্র আধুনিকায়ন করেছে।

গত মাসে হুথিরা একটি অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালী এবং লোহিত সাগরের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার (৯০ মাইল) উপকূলীয় এলাকা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজেদের দখলে নেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান এই রুটের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ ও চাপ আরও বেড়ে গেছে। এছাড়া এই অগ্রাভিযানটি গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৃহত্তর যুদ্ধের নতুন একটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করেছে, যার জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।

সৌদি আরবে হুথিদের হামলা

প্রেসিডেন্ট লিডারশিপ কাউন্সিল হিসেবে পরিচিত ইয়েমেন সরকার যখন এই সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেয়, ঠিক তখনই হুথিরা দাবি করে যে তারা সৌদি আরবের রিয়াদ এবং খোরাইস এলাকায় অবস্থিত সৌদি আরামকো (Saudi Aramco) স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। গত ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রায় ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে দাবি করে তারা। তবে এ বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রেসিডেন্ট আল-আলিমী জানিয়েছেন, সংঘাত নিরসনের সমস্ত কূটনৈতিক সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ার পরই এই পাল্টা আক্রমণ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি সৌদি আরবকে তাদের অবিচল সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং ইয়েমেনের আঞ্চলিক মিত্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের পিএলসি (PLC) বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার আহ্বান জানান।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ও ইয়েমেনি মিত্ররা মিলে হুথিদের বিরুদ্ধে একটি বড় হামলার পরিকল্পনা করছিল, যেখানে সৌদিরা আকাশপথে এবং ইয়েমেনি বাহিনী স্থলভাগে লড়াই পরিচালনা করছে। ওয়াশিংটন ইয়েমেনে রিয়াদের অভিযানকে সমর্থন জানাতে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে এবং কিছু আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ মূলত রক্ষণাত্মক সামরিক সহায়তা প্রদান করছে।

হুথিদের শক্ত অবস্থান ও মানবিক সংকট

গত মাসে এক ঝটিকা অভিযানে বাব এল-মান্দেব প্রণালী দখল করার পর থেকেই হুথিরা যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ অংশের এই প্রবেশদ্বারটি ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। এর পাশাপাশি, গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের নিকটবর্তী পাহাড়গুলোর দখল নিয়ে সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তাইজ ও আদেনকে সংযোগকারী শেষ সড়কটি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে আড়াই লাখেরও বেশি বেসামরিক মানুষ ও সরকারি সেনা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানিয়েছে, চলমান এই তীব্র লড়াইয়ের কারণে ইয়েমেনের কিছু এলাকায় প্রতি চার পরিবারের তিনটিই এখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ত্রাণ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স