মণিপুরে ফের সহিংসতা

গুলি ও শিরশ্ছেদে ৯ জনকে হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ

ভারতের মণিপুর রাজ্যের পাহাড়ি জেলাগুলোয় আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত থেকে ২৪ ঘণ্টায় এসব ঘটনায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ১৪টি বাড়িতে। এ পরিস্থিতিতে রাজ্যে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মণিপুরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

শুক্রবার রাতে কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে কথিত গোলাগুলির ঘটনায় কুকি নারী ডমখোনেই তোথাং নিহত হলে সহিংসতার সূত্রপাত হয়। পুলিশের ভাষ্য, চাসাদ গ্রামে অবৈধ বাংকার উচ্ছেদ করতে মণিপুর পুলিশ, ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা যৌথ অভিযান চালান। এ সময় স্থানীয় নারীরা অভিযান ব্যাহত করার চেষ্টা করেন। তখন অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। জবাবে পাল্টা গুলি চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।

সেদিন রাতেই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে আবারও গোলাগুলি হয়। নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের ১৪টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, চাসাদ গ্রামের স্বেচ্ছাসেবকদের গ্রেপ্তার ও আটকাদেশের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে রাত সাড়ে নয়টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। কুকি উইমেন ইউনিয়নের দাবি, এ ঘটনায় ২৩ বছর বয়সী মাইকেল গামিনলেন হাওকিপ নামের এক তরুণও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নাগা বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করেছেন।

গত শনিবার সকালে রাজ্যে আবার সহিংসতা শুরু হয়। অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা চাসাদ থানায় আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোর পাঁচটার দিকে আবার গোলাগুলি শুরু হয়, যা চলে সকাল সাতটা পর্যন্ত। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কামজং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থানার চারপাশের ৪০০ মিটার এলাকায় মানুষ জড়ো হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কামজং জেলার আরেকটি ঘটনায় দুই নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হয়েছেন। তাদের নাম গাচানসো নিংশেন (৩০) ও লেইশিশান হুঙিয়ো (৫০)। দুজনই নিংচৌ গ্রামের বাসিন্দা। শনিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে চাসাদের প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নিংচৌ চিনডং গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। 

সরকারি সূত্রগুলো বলেছে, সীমান্তের ওপার থেকে তৎপর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এতে জড়িত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি। এর আগে শনিবার ভোর পাঁচটার দিকে মাকুই গ্রামে এক হামলায় তিন নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের ওপর কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মাচুংগাম্মাম, আজিনপৌ রিংকাংমাই ও রবার্ট। গ্রামবাসীর অভিযোগ, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আজিনপৌ রিংকাংমাইয়ের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন লেখার সময়ও সেখানে গুলিবর্ষণ চলছিল। এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।

শনিবার সকাল ছয়টার দিকে কাংপোকপি জেলার তাপোন গ্রামেও হামলার ঘটনা ঘটে। মাকুই গ্রামের কাছে ইম্ফল-তামেংলং সড়কে সন্দেহভাজন সশস্ত্র কুকিদের অতর্কিত হামলায় এক নাগা গ্রাম স্বেচ্ছাসেবক নিহত এবং দুজন আহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহত ব্যক্তির নাম মাচুংওয়াংবৌ (৩৫)। তিনি থালোন গ্রামের বাসিন্দা। আহত দুজন হলেন- নাহাসন (২৯) ও মাথাংগামবৌ (৩০)। ওই এলাকায় দুপুর পর্যন্ত গোলাগুলি চলেছে।

অন্যদিকে উখরুল জেলার কনজাং গ্রামের কাছে ২০২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে অতর্কিত হামলায় সন্দীপ রাই (৩০) নামের এক যাত্রী নিহত হয়েছেন। তিনি সেনাপতি জেলার তাফৌ সেনাপতি নেপালি গ্রামের বাসিন্দা। শনিবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে গাড়িতে করে যাওয়ার সময় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা তার ওপর হামলা চালান বলে জানিয়েছে পুলিশ। হামলার উদ্দেশ্য ও হামলাকারীদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস