দক্ষিণ চীন সাগরে একটি চীনা মাছ ধরার নৌকার বিরুদ্ধে জলকামান ব্যবহারের ঘটনায় তাইওয়ানকে ‘পরিণতি ভোগ করতে হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে চীন। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। একই সময়ে তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির খবর জানিয়েছে তাইপে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসে তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি চীনা মাছ ধরার নৌকার ওপর জলকামান ছোড়ে তাইওয়ান কোস্ট গার্ড। নিষিদ্ধ জলসীমা থেকে সরে যাওয়ার সতর্কবার্তায় নৌকাটি সাড়া না দেওয়ায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে জানায় তাইওয়ানের কোস্ট গার্ড। পরে নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। কাছাকাছি থাকা আরেকটি চীনা নৌযান সেটিকে টেনে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে তাইওয়ানের কোস্ট গার্ড।
চীনের তাইওয়ান-বিষয়ক দপ্তরের মুখপাত্র চেন বিনহুয়া বলেন, প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জ ও এর আশপাশের জলসীমার ওপর চীনের ‘অবিসংবাদিত সার্বভৌমত্ব’ রয়েছে। ওই এলাকায় চীনের মূল ভূখণ্ডের নৌযানগুলোর চলাচল সম্পূর্ণ বৈধ ও ন্যায্য বলেও দাবি করেন তিনি। চেন বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় চীনা নৌযানের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের আচরণ বিপজ্জনক এবং তা নৌযানের কর্মীদের জীবন ও সম্পদকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ ধরনের আচরণ দুই প্রণালির মধ্যে উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে এবং এর সব পরিণতি তাইওয়ানকে বহন করতে হবে। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি চীনা এই মুখপাত্র।
অন্যদিকে, ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত তাইওয়ানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, কোস্ট গার্ড স্বাভাবিক আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করেছে এবং সতর্ক ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করেছে।
প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ তাইওয়ান ও হংকংয়ের মাঝামাঝি দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত। তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপপুঞ্জটির দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটারের বেশি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মূল ভূখণ্ড থেকে দূরবর্তী অবস্থানের কারণে চীনের সম্ভাব্য হামলার মুখে দ্বীপপুঞ্জটি ঝুঁকিপূর্ণ। দ্বীপপুঞ্জটি একটি জাতীয় উদ্যান। সেখানে একটি বিমান অবতরণক্ষেত্র থাকলেও স্থায়ী বেসামরিক জনবসতি নেই। দ্বীপপুঞ্জটির দৈনন্দিন নিরাপত্তার দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর পরিবর্তে তাইওয়ানের কোস্ট গার্ড পালন করে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। তবে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানের সরকার বেইজিংয়ের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জসহ তাইওয়ানের কোনো সার্বভৌমত্বের দাবিই চীন স্বীকার করে না। সাম্প্রতিক সময়ে দ্বীপপুঞ্জটির আশপাশে চীনা কোস্ট গার্ডের টহলও বেড়েছে।
তাইপেতে আয়োজিত একটি ফোরামে তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপমহাসচিব লি ওয়েন বলেন, চীন ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টির কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন ধরনের নৌযান ব্যবহার করছে। এর মধ্যে সামুদ্রিক মিলিশিয়ার নৌকা ও গবেষণাজাহাজও রয়েছে। লি ওয়েনের ভাষায়, সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতের পর্যায়ে না পৌঁছেও পরিচালিত এসব ‘গ্রে জোন’ কর্মকাণ্ড নৌপরিবহন ব্যাহত করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি করার আশঙ্কা তৈরি করছে।
এদিকে, বুধবার তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্বীপটির আশপাশে চীনের আরেকটি ‘যৌথ যুদ্ধ-প্রস্তুতি টহল’ শনাক্ত করার কথা জানায়। এতে জে-১৬ যুদ্ধবিমানসহ ১৩টি চীনা সামরিক উড়োজাহাজ এবং অজ্ঞাতসংখ্যক নৌবাহিনীর জাহাজ অংশ নেয় বলে জানানো হয়। এর আগে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, বিমানবাহী রণতরি লিয়াওনিং এবং এর সঙ্গে থাকা অন্যান্য জাহাজ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। তবে মহড়ার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের কাছে জলকামান ব্যবহারের ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন তাইওয়ান প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি, কোস্ট গার্ডের টহল এবং সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় বেইজিংয়ের হুঁশিয়ারি ওই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তবে চীন কী ধরনের পরিণতির কথা বলছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: রয়টার্স