মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি সৌদি আরব। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উন্নত রাডার এবং বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট রয়েছে দেশটির। কিন্তু প্রতিবেশী ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি সামরিক সক্ষমতার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছিল এবং সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর অব্যাহত ছিল। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বিশ্লেষণেও উঠে আসে, আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সামরিক শক্তিতে এগিয়ে সৌদি আরব
প্রচলিত সামরিক শক্তির বিচারে সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের তুলনা করা কঠিন। সৌদি বাহিনীর হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উন্নত রাডার এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এপির তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ২০২৬ সালের সামরিক ব্যয়ের বাজেট ছিল প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) অস্ত্র হস্তান্তরবিষয়ক তথ্যও দেখায়, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ।
অন্যদিকে, হুথিদের কাছে সৌদি আরবের মতো পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহিনী কিংবা সমপর্যায়ের প্রচলিত সামরিক অবকাঠামো নেই। কিন্তু তাদের সামরিক কৌশল ভিন্ন। তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অনিয়মিত যুদ্ধপদ্ধতি ব্যবহার করে তারা প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে।
কেন ভেদ করা কঠিন আকাশ প্রতিরক্ষা?
আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্ত, অনুসরণ এবং ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু প্রতিটি হামলা প্রতিহত করার নিশ্চয়তা কোনো ব্যবস্থাই দিতে পারে না। এপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ছড়িয়ে রয়েছে। ইয়েমেনের সঙ্গে দেশটির সীমান্তও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ। ফলে একই সঙ্গে সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ছাড়া একাধিক দিক থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা হলে প্রতিরক্ষা রাডার, শনাক্তকরণব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর চাপ বাড়ে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের উড্ডয়নপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা থাকলে সেগুলোকে শনাক্ত ও প্রতিহত করাও কঠিন হতে পারে। এপির উদ্ধৃত বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা প্রতিরক্ষা রাডারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির কৌশল রপ্ত করেছে।
কম খরচের অস্ত্রে বেশি চাপ
হুথি বাহিনীর কৌশলের অন্যতম দিক হলো প্রতিপক্ষকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করা। একটি তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়তে পারে। তবে সব হামলার ক্ষেত্রে ব্যয়ের অনুপাত একই নয়। ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম এবং সেগুলো প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ব্যবস্থার ব্যয় ভিন্ন। তাই নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া প্রতিটি হামলায় সৌদি আরব কত অর্থ হারাচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো ১ হাজার মাইলেরও বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাদের হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনা নয়; বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথেও চাপ সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমে সরাসরি সামরিক বিজয় ছাড়াই অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জনমনে উদ্বেগ তৈরি করা সম্ভব।
ইরানের সহায়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়টি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে হুথিদের পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনী হিসেবে দেখা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিরা ইয়েমেনে কিছু ধরনের ড্রোন ও অস্ত্রের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত উপাদানের ক্ষেত্রে বাইরের সহায়তার ওপর তাদের নির্ভরতা রয়েছে। ফলে তাদের সক্ষমতাকে শুধু বিদেশি অস্ত্র সরবরাহ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; স্থানীয় উৎপাদন, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভাজন
সৌদি আরবের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো ইয়েমেনের সরকারপন্থী বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন। স্টিমসন সেন্টারে ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। ফলে তাদের মধ্যে সমন্বিত সামরিক কমান্ড ও অভিন্ন রাজনৈতিক পরিকল্পনা গড়ে তোলা কঠিন।
বিশ্লেষক ক্রিস্টিয়ান আলেকজান্ডারের মতে, শুধু বিমান হামলা বা অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে হুথিদের দীর্ঘমেয়াদে পরাজিত করা কঠিন। পুনর্দখল করা অঞ্চল ধরে রাখতে হলে স্থানীয় বাহিনীর সমন্বয়, জনগণের আস্থা এবং কার্যকর প্রশাসন প্রয়োজন। রয়টার্সও ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কিছু এলাকায় অগ্রগতি অর্জন করলেও অন্য ফ্রন্টে তাদের অবস্থান দুর্বল ছিল। অর্থাৎ সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা থাকলেই দ্রুত ও স্থায়ী বিজয় নিশ্চিত হয় না।
সামনে সৌদি আরবের চ্যালেঞ্জ কী?
সৌদি আরবের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে- বিশেষায়িত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা বাড়ানো, আকাশ প্রতিরক্ষার সরবরাহ ও প্রস্তুতি বজায় রাখা, হুথিদের নতুন ধরনের হামলার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং ইয়েমেনের মিত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে পাল্টা হামলার মাধ্যমে সামরিক চাপ বাড়াতে গিয়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা হয়েছে; তবে আলোচনা বা বিবৃতি থেকেই সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয় না।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের সামরিক শক্তি হুথিদের তুলনায় অনেক বেশি হলেও বর্তমান সংঘাত দেখাচ্ছে, আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার একাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। বিশাল ভূখণ্ড রক্ষা, তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল অস্ত্রের মোকাবিলা, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহব্যবস্থা এবং ইয়েমেনের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা সামাল দেওয়াই রিয়াদের জন্য বড় পরীক্ষা। সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি ও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংঘাতের স্থায়ী অবসান কঠিন হতে পারে।
সৌদি আরামকোর দাহরান কমপ্লেক্সে হামলা
হুথিদের হামলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য ‘সন্ত্রাসী হুমকি’
হোয়াইট হাউসে তিন সংবাদমাধ্যমকে প্রবেশের নির্দেশ
হরমুজের কাছে আসলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে: আইআরজিসি
নতুন মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরানের দুই পদক্ষেপ