রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে প্রায় এক বছর ধরে ভারতকে চাপ দিয়ে আসছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার যুক্তি ছিল, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির আয় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনকে অর্থ জোগাচ্ছে। এ কারণে গত বছর ভারতের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কও আরোপ করেছিলেন তিনি।
ইকোনমিক টাইম জানায়, কিন্তু এবার পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বাড়ছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সমঝোতা করে রাশিয়ার ডিজেল বিশ্ববাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন ট্রাম্প।
এখানেই প্রশ্নটি সামনে আসে। জ্বালানির দাম যখন মার্কিন ভোটারদের অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করছে, তখন রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। তাহলে ভারতের ক্ষেত্রে একই যুক্তি গ্রহণ করতে আপত্তি কোথায়? সাধারণ মানুষের জ্বালানির ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতাকে কি পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণের জন্য উপেক্ষা করা যায়?
সবার আগে মার্কিন ভোক্তার স্বার্থ
গত ৯ অক্টোবর পুতিনের সঙ্গে সফল আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের সমঝোতার কথা জানান ট্রাম্প। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। নভেম্বরে আসার কথা আরো ৫ লাখ টন। এরপর সরবরাহ করা হতে পারে ১০ লাখ টন। শোধনাগারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে আরো ৩০ লাখ টন ডিজেল আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি, পণ্য পরিবহন ও শীতকালে ঘর গরম রাখার বিভিন্ন ব্যবস্থায় ডিজেল গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। এর দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্যের দাম ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেলের দাম ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জ্বালানি ব্যয় কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেছেন ট্রাম্প।
এখানে বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। যে প্রশাসন এতদিন বলে এসেছে, রাশিয়ার তেল কেনার মাধ্যমে মস্কোর যুদ্ধের অর্থায়ন হচ্ছে, সেই প্রশাসনই এখন মার্কিন ভোক্তাদের জন্য রাশিয়ার জ্বালানি আনতে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিতে প্রস্তুত। ভারতের যুক্তিও ছিল অনেকটা এ রকম। দেশটি তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে ভারতীয় ভোক্তাদেরও বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়।
নয়াদিল্লি কখনোই বলেনি যে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা গ্রহণযোগ্য। ভারতের বক্তব্য ছিল, জ্বালানির নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কোটি কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে জ্বালানি আমদানির উৎস নির্ধারণ করা যায় না। এখন মার্কিন জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেলের বাড়তি দাম তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করায় ভারতের সেই যুক্তির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
ছাড় দিলেই কি কমবে ডিজেলের দাম?
তবে চুক্তি ঘোষণা করা আর পাম্পে জ্বালানির দাম কমানো এক বিষয় নয়। বিশ্লেষকদের সন্দেহ, রাশিয়ার পক্ষে প্রতিশ্রুত পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করা সহজ হবে না। দেশটির জ্বালানি শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার রপ্তানি সক্ষমতাও ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে মস্কো নিজেও ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি পৌঁছাতেও সময় লাগবে। প্রতিশ্রুত সরবরাহের পরিমাণ বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় সীমিত। ফলে এই উদ্যোগ কিছুটা বাড়তি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম দ্রুত কমিয়ে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। পুতিনের সুবিধা হয়, এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি মার্কিন ভোক্তারা সামান্যই স্বস্তি পান, তাহলে এর কূটনৈতিক ও আইনগত বিরোধিতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ভারতের যুক্তি মেনে নেওয়ার পথে কংগ্রেসই বাধা?
জ্বালানির প্রশ্নে সাধারণ মানুষের স্বার্থ যে ভূরাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে, ট্রাম্প কি এবার ভারতের দীর্ঘদিনের যুক্তি স্বীকার করবেন? তার জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে মার্কিন কংগ্রেস। গত ১১ অক্টোবর সাতজন মার্কিন সিনেটর রাশিয়ার ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তাদের মধ্যে রিপাবলিকান দলের সুসান কলিন্স, লিসা মারকাউস্কি, থম টিলিস ও জন কার্টিস ছিলেন। ডেমোক্র্যাট দলের জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেনও তাদের সঙ্গে একমত হন।
সিনেটরদের বক্তব্য, ২০২২ সালে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, যাতে মার্কিন অর্থ পুতিনের যুদ্ধের অর্থায়নে ব্যবহৃত না হয়। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করেনি এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাও দেয়নি। টিলিস আরো বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আইন মেনে চলছে কি-না, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে ভোটাভুটি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের জন্য বিষয়টি আরো জটিল, কারণ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত আইনে রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতাদের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রয়েছে। প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে পরিচিত এই আইন ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থানকে আরো কঠোর করেছে। তবে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের দাবি, এই পদক্ষেপ নেওয়ার যথেষ্ট আইনি ক্ষমতা প্রশাসনের রয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা-ছাড় দিয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জাহাজে তোলা জ্বালানির ক্ষেত্রে এ ছাড় প্রযোজ্য।
কিন্তু প্রশাসন নিজেদের সিদ্ধান্তকে আইনসম্মত মনে করলেই যে কংগ্রেসের যাচাই-বাছাইয়ে তা টিকে যাবে, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের প্রয়োজনে রাশিয়ার ডিজেল কেনার জন্য বিশেষ আইনি ব্যাখ্যা কিংবা সীমিত পরিসরে ছাড়ের আশ্রয় নেয়, তাহলে ভারতের রাশিয়ার তেল কেনার কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অবশ্য উল্টো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। কংগ্রেসের বিরোধিতায় ট্রাম্প নিজের অবস্থান আরো কঠোর করে দেখাতে পারেন, যদিও তার প্রশাসন নিজেদের জন্য ছাড় আদায়ে ব্যস্ত থাকবে।
ভারত কি নিষেধাজ্ঞায় ছাড় পাবে?
ওয়াশিংটন কীভাবে এই ছাড় কার্যকর করে, তা পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ঘোষণার প্রভাব পর্যালোচনা করছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নিজেদের জ্বালানি আমদানির জন্য বিশেষ ছাড় তৈরি করতে পারে, অথচ রাশিয়া ও ইরান-বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা আইন আনুষ্ঠানিকভাবে লঙ্ঘন না করে, তা নিয়ে কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন।
ভারতের জন্য কোনো বিশেষ ছাড়ের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে আলোচনা হলেও বিষয়টি অমীমাংসিত রয়েছে। ভারতের স্বার্থ তাৎক্ষণিক শুল্কের হিসাবের চেয়েও বড়। রাশিয়া থেকে তেল কেনার ফলে দেশটি জ্বালানির বিকল্প সরবরাহ পেয়েছে এবং শোধন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার কিছু অপরিশোধিত তেল ভারতে পরিশোধন করে ডিজেলসহ বিভিন্ন পরিশোধিত জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি জটিলতা রয়েছে। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক স্টিফেন মুল বলেছেন, ভারতের হাতেও দর-কষাকষির সুযোগ রয়েছে। রাশিয়া থেকে ভারত যে অপরিশোধিত তেল কেনে, তার একটি অংশ পরিশোধনের পর ডিজেল হিসেবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাজারেও পৌঁছায়। মুলের মতে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ভারতের পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ট্রাম্পকে সেই সম্ভাবনাও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। এমন পদক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্ক আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাণিজ্য আলোচনা ও পাকিস্তান বিষয়ে ওয়াশিংটনের নীতির কারণে সম্পর্ক আগে থেকেই চাপে রয়েছে।
ওয়াশিংটন চাইলে অপরিশোধিত তেল কেনা এবং জাহাজে আগে থেকেই তোলা ডিজেলের সাময়িক আমদানিকে আলাদা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। আইনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এতে নীতিগত অসংগতির প্রশ্নটি দূর হবে না।
ট্রাম্প কি কঠিন শিক্ষাটি স্বীকার করবেন?
রাশিয়ার ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প ভারতের সব যুক্তি মেনে নিয়েছেন। তিনি বলতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যবস্থা সাময়িক, সীমিত এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সরবরাহ-সংকট মোকাবিলার জন্য নেওয়া হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর জ্বালানির দামের চাপ কমলে আবার কঠোর নিষেধাজ্ঞানীতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগও তার রয়েছে।
জ্বালানির দাম বেশি থাকলে উৎস যা-ই হোক, আরও সরবরাহ নিশ্চিত করার চাপ বাড়বে। দাম কমে গেলে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ানোর সুযোগ পাবেন ট্রাম্প। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের আগের অবস্থান যতটা অনড় বলে মনে হয়েছিল, বাস্তবে তা ততটা নয়।
রাশিয়া সম্পর্কে ভারতের সব অবস্থানকে সমর্থন করার প্রয়োজন নেই ট্রাম্পের। তবে তিনি স্বীকার করতে পারেন, জ্বালানির নিরাপত্তার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের জন্য এক নিয়ম এবং নয়াদিল্লির জন্য আরেক নিয়ম থাকা উচিত নয়। সমস্যা হলো, ট্রাম্পের নিজের দলের সদস্যসহ দুই দলের সিনেটররা যখন রাশিয়ার ডিজেল আমদানির বিরোধিতা করছেন, তখন ভারতের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া রাজনৈতিকভাবে আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু রাশিয়ার তেল বা ডিজেল কেনার নয়। প্রশ্ন হলো, নিজের দেশের ভোটারদের স্বার্থে যে নীতি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, অন্য দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে সেই একই যুক্তি মানতে ট্রাম্প কতটা প্রস্তুত। ভারতের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টি হয়তো তার সামনে স্পষ্ট। কিন্তু সেই শিক্ষা প্রকাশ্যে স্বীকার করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা তার আছে কি না, সেটিই এখন দেখার।