ইরানের সঙ্গে আবারও সামরিক সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়েও বেশি মূল্য দিতে হতে পারে। সামরিক সক্ষমতায় শ্রেষ্ঠত্বের দাবি থাকলেও উন্নত অস্ত্র ও বিপুল গোলাবারুদ সব সময় কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের নিশ্চয়তা দেয় না। অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া, সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, সব মিলিয়ে নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির (এমএনএ) ১৬ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতে চাপ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে- বিপুল সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের অবকাঠামো ও অস্ত্রব্যবস্থার ক্ষতি করা সম্ভব হলেও তাতে রাজনৈতিক বা কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হয় না। কোনো অভিযানে কতটি হামলা চালানো হয়েছে কিংবা কত গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে, শুধু তা দিয়ে বিজয় নির্ধারণ করা যায় না। বরং সেই ব্যয়ের বিপরীতে কী লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
যদি কোনো অভিযানে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যয় এবং সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি হয়, কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না হয়, তাহলে একই কৌশল অব্যাহত রাখলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। অথচ কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হবে কি না, তা অনিশ্চিত থেকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি ও প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিও ওয়াশিংটনকে ধরে রাখতে হয়।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত ধরে রাখা। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হামলা প্রতিহত করতে বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে প্রস্তুত মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। তখন নতুন করে উৎপাদন ও সরবরাহের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু উন্নত সামরিক অস্ত্রের উৎপাদন শুধু অর্থ বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য জটিল সরবরাহব্যবস্থা, বিশেষায়িত কাঁচামাল, দক্ষ জনবল এবং নির্দিষ্ট শিল্প সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে নতুন বাজেট অনুমোদন করলেও অল্প সময়ে ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত পূরণ করা সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু হামলা চালানোর সামর্থ্য নয়, বরং এর ফলে অন্যান্য সামরিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তও বৃহত্তর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ। অন্যদিকে, ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশকে জটিল করে তুলতে পারে।
দ্য টাইমস-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এমএনএ জানিয়েছে, সামরিক হামলা ও চাপের মধ্যেও ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। যদিও এই সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মাত্রা ও কার্যকারিতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন, তবু সামরিক পরিকল্পনায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশের সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানা আর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল করা এক বিষয় নয়।
ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত, কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং অস্ত্র উৎপাদন বা ব্যবহারের সক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ থাকলে প্রতিপক্ষ আবারও সামরিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে হামলাকারী পক্ষকে একই লক্ষ্য অর্জনে বারবার অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হতে পারে। এ কারণে কোনো দেশের ওপর পরিচালিত হামলার সংখ্যা দিয়ে তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ইরানের সঙ্গে আবার সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে গোলাবারুদ, জ্বালানি, রসদ, সেনা পরিবহন এবং সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনার নিরাপত্তায় নতুন করে ব্যয় করতে হবে। সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো মেরামত বা প্রতিস্থাপনের খরচও যুক্ত হবে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো, সীমিত লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান পাল্টা হামলা ও উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক পরিকল্পনায় যে ব্যয় অনুমান করা হয়েছিল, চূড়ান্ত ব্যয় তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, নতুন সামরিক সংঘাতে যে ব্যয় হবে, তার বিপরীতে প্রত্যাশিত সাফল্য কতটা নিশ্চিত। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য যদি ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করা হয়, তাহলে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলতে পারে। আর সামরিক চাপ দিয়ে তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেই চাপ কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল আনবে কি-না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।