ইরানের সাথে সমঝোতার আগেই ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর হামলার হুমকি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও কাটছে না। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন কূটনৈতিক তৎপরতা কিংবা নতুন সামরিক পদক্ষেপের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও বড় ধরনের চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছে, এমন স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তবে সীমিত সময়ের জন্য উত্তেজনা কমাতে একটি সমঝোতা হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) মধ্যস্থতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরব জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই সমঝোতার বিষয়ে অগ্রগতির ঘোষণা আসতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা এ সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় ইরান-বিষয়ক শাখার সাবেক প্রধান ও ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিত্রিনোভিচের মতে, কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেই শিগগির বড় কোনো চুক্তি হবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কারণ, সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় বড় ছাড় দিতে কোনো পক্ষই প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না। ইরান ইন্টারন্যাশনালকে তিনি বলেন, ‘অগ্রগতি অর্জন করতে হলে কোনো এক পক্ষকে উল্লেখযোগ্য ছাড় দিতে হবে। ইরানের পক্ষ থেকে আমি তেমন কিছু দেখছি না।’

যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হোক। অন্যদিকে, তেহরানের অগ্রাধিকার হলো মার্কিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার জানিয়েছেন, তেহরানের দেওয়া সাত দিনের প্রস্তাব এখনো বহাল রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানের শর্ত মেনে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, পূর্ণাঙ্গ চুক্তির তুলনায় সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনা বেশি। তার বিশ্লেষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরান—উভয়েরই স্বল্পমেয়াদে উত্তেজনা কমানোর স্বার্থ রয়েছে। তবে এতে দুই পক্ষের মৌলিক বিরোধের অবসান নাও হতে পারে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভাতাঙ্কার মতে, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প একটি কূটনৈতিক সাফল্য দেখাতে চাইতে পারেন। অন্যদিকে, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অর্থনীতিও স্বস্তি খুঁজছে।

ইরান ইন্টারন্যাশনালকে ভাতাঙ্কা বলেন, ‘এমন একটি চুক্তি হতে পারে, যা কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের জন্য যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি তৈরি করবে।’ তবে তার মতে, ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত কোনো সমঝোতা হিসেবে ট্রাম্প উপস্থাপন করতে পারবেন, এমন পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে তেহরান রাজি হবে সেই লক্ষণ খুব কম। ভাতাঙ্কার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের নেতৃত্ব মনে করে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য দেশটিকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির সক্ষমতাও তেহরান দেখিয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ সীমিত সমঝোতায় উৎসাহিত করতে পারে। তবে বড় ধরনের ছাড় দিলে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে বিভক্তি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি জোরদার করেছেন। রোববার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, তেহরান অবস্থান পরিবর্তন না করলে যুক্তরাষ্ট্র ‘শিগগিরই কাজ শেষ করবে’। একই সঙ্গে ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে তিনি নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানান। নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসানকে ইসরায়েলের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রয়োজন হলে ওয়াশিংটনের সহায়তা ছাড়াও ইসরায়েল পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে তিনি জানিয়েছেন।

সোমবার নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থনের প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড, আমাদের একটি কাজ শেষ করতে হবে। আপনি বলেছেন, আমরাও একসঙ্গে সেটি শেষ করবো। আমরা কাজটি শেষ করবো, আর কেউ তা করবে না।’ নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য এবং ট্রাম্পের সামরিক হুমকি এমন সময়ে এসেছে, যখন মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো সমঝোতার পথ খুঁজছে। ফলে সীমিত চুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও নতুন হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।