ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হুমকি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে তেহরান। চিঠিতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি এবং ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত শক্তিশালী বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে দেশটি। সোমবার (২০ অক্টোবর) মেহের নিউজ এজেন্সির (এমএনএ) প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত ও ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি গোলাম হোসেইন দারজি চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি নেতাদের বক্তব্যকে ‘অহংকারী হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, এসব হুমকি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের অংশ। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
চিঠিতে ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে, যার মধ্যে জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) বোমা ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে। শক্তিশালী এই বোমাটি ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত। ইরানের চিঠি অনুযায়ী, একই দিন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প ওই অস্ত্র নিয়ে কথা বলেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে আরও হামলার হুমকি দেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ১৮ অক্টোবর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার প্রস্তুতির কথা জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন করে হামলা হলে ইরানের সব জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও তিনি কথা বলেছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। কাটজের বরাতে চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে মোট ৩৫ হাজার বোমা ফেলেছে। তবে এসব বক্তব্য ও পরিসংখ্যান ইরানের চিঠিতে উদ্ধৃত দাবি; প্রতিবেদনে এগুলোর স্বাধীন যাচাই দেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
ইরানের অভিযোগ, বেসামরিক অবকাঠামো ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে। চিঠিতে ১৯৪৯ সালের চারটি জেনেভা কনভেনশন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তেহরানের বক্তব্য, বেসামরিক জনগণকে ভয় দেখানো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়। ইরান আরও অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকটি সদস্যদেশের নীরবতা কিংবা সমর্থন ইসরায়েলের অবস্থানকে আরও কঠোর করেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
চিঠিতে ইরান জাতিসংঘ মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অবিলম্বে অবৈধ সামরিক হুমকি বন্ধের আহ্বান জানানোর দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকির স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
তেহরান নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আয়োজন, সম্ভাব্য আগ্রাসনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং হামলার ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে। ইরানের ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদ নীরব থাকলে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। চিঠিতে জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। দেশটি বলেছে, জনগণ, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
ইরানের সতর্কবার্তা, নিরাপত্তা পরিষদ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তেহরান আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে এবং যেকোনো নতুন আগ্রাসনের জবাব দেবে। এ ধরনের হামলা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক নথি হিসেবে বিতরণের অনুরোধ জানিয়েছে ইরান।