একসময় ইউরোপ ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্বের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হতো। ক্রীড়া, সংস্কৃতি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, অস্ত্র উৎপাদন এবং বাণিজ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছিল দুই পক্ষের নিবিড় যোগাযোগ। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির মৃত্যু, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে বিরোধ সেই সম্পর্ককে গভীর সংকটে ফেলেছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন কি ইউরোপের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ তৈরি করবে, নাকি রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও দূরত্ব আরও বাড়বে?
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের অবনতি এতটাই গভীর হয়েছে যে শুধু সরকার পরিবর্তনেই পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রগতি, অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসান এবং গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নতি এসব বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপের ওপরই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করতে পারে।
২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল ইসরায়েলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছিলেন, ইউরোপ ও ইসরায়েল বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ।
কিন্তু গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সেই সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ বেড়েছে। কোথাও সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে, কোথাও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি উঠেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা উচিত কি না, তা নিয়েও বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড ও স্পেন দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতি এবং গাজায় সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে আসছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও গাজায় সংঘটিত ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান; অভিযোগগুলোর আইনগত নিষ্পত্তি পৃথক বিষয়।
যুক্তরাজ্যও অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগও তুলেছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহের কাজে যাওয়া ইউরোপীয় কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের ওপর বসতিস্থাপনকারীদের হামলার অভিযোগ দুই পক্ষের সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের কর্মকর্তারা এ ঘটনার শিকার হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট আবার ক্ষমতায় এলে সম্পর্কের ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, নেতানিয়াহু যদি কট্টর ডানপন্থীদের নিয়ে আবার সরকার গঠন করেন, তাহলে সম্পর্কের কিছু ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নিকোলা পেরুজিনিও সতর্ক করেছেন, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় ফিরলে গাজার মানুষের দুর্বিষহ জীবনযাত্রার অবসান ঘটার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ অবস্থায় তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা আরও কঠিন হতে পারে।
তবে নেতানিয়াহুর বিদায়ই যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা দেবে, তা নয়। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত মধ্যপন্থী ইয়াশার দলের নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে নীতিগত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
ইসরায়েলের মিতভিম ইনস্টিটিউটের এক বার্ষিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ ইসরায়েলি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বন্ধু নয়, বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছেন। বিপরীতে মাত্র ১৪ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বন্ধু বলে বিবেচনা করেছেন।
এই মনোভাবের পেছনে রয়েছে গাজা যুদ্ধ, ইউরোপের সমালোচনা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে দেশটির জনগণের উদ্বেগ। ইসরায়েলি সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাগত বাস্তবতা উপেক্ষা করে করা হচ্ছে।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক মেকেলবার্গের মতে, ইসরায়েলে তুলনামূলক উদারপন্থী সরকার গঠিত হলে ইউরোপের সঙ্গে সংলাপ আরও যুক্তিসংগত হতে পারে। তবে সম্পর্ক রাতারাতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে না।
এ ধরনের সরকার গাজায় মানবিক সহায়তা বাড়ানো, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের গতি কমানো এবং বিতর্কিত ই১ বসতি পরিকল্পনা পরিত্যাগের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু ইউরোপের আস্থা ফেরাতে এসব উদ্যোগই যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো জুলি এম নরম্যানের মতে, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে বাস্তব অগ্রগতি এবং দখলদারত্বের অবসান দেখতে চায়।
গাজায় যুদ্ধের শুরুতে পশ্চিমা নেতাদের অনেকেই ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক আদালত, শ্রমিক সংগঠন, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের চাপ বাড়তে থাকে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার আইনের অধ্যাপক নেভ গর্ডনের মতে, ইউরোপের কয়েকটি দেশের শাসকগোষ্ঠী এখন জনমতের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষায়, ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন সরকারগুলোর প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপেও ইউরোপের কয়েকটি দেশে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের বসন্ত থেকে ২০২৬ সালের বসন্তের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীর হার ৬১ থেকে ৬৯ শতাংশে, ইতালিতে ৬৬ থেকে ৭৫ শতাংশে এবং জার্মানিতে ৬৪ থেকে ৭৩ শতাংশে বেড়েছে।
ইতালীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাথালি তোচ্চির মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিক্ষোভ ইউরোপের ইসরায়েল-নীতিতে পরিবর্তন আনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল অংশীদারত্ব চুক্তি স্থগিতের উদ্যোগ এবং বসতি থেকে আমদানি নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপে এই চাপের প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
তবে ইউরোপের সব দেশ একই অবস্থানে নেই। বিশেষ করে জার্মানির মতো ইসরায়েলের ঐতিহাসিক মিত্র দেশে ইসরায়েলকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতি নিয়ে জনসমালোচনা থাকলেও সরকারগুলোর অবস্থানে পরিবর্তন সীমিত বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
ইউরোপে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমতে থাকায় নেতানিয়াহু সরকার মহাদেশটির কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। জাতীয়তাবাদ, অভিবাসনবিরোধী অবস্থান এবং ইসলাম সম্পর্কে কঠোর মনোভাবের মতো বিষয়ে এসব দলের সঙ্গে ইসরায়েলি সরকারের কিছু মিল রয়েছে।
তবে ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ঐতিহাসিক ইহুদিবিদ্বেষের সম্পর্ক থাকায় এই সহযোগিতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও রয়েছে।
বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মেনাখেম ক্লেইনের মতে, বর্তমান ইসরায়েলি সরকার বন্ধু ও মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। সেই ক্ষত সারাতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়লেও নির্বাচনী প্রচারে বিষয়টি খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে না। চ্যাথাম হাউসের একটি নিবন্ধে মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকান ডায়ালগ ফোরামের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়াকভ কাটজ লিখেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান একঘরে হয়ে পড়া নির্বাচনী বিতর্কে তুলনামূলকভাবে আড়ালে রয়েছে।
ইসরায়েলি রাজনীতিতে বরং হামাসকে দুর্বল করা, হিজবুল্লাহ ও ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো, জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঘিরে নিরাপত্তা ব্যর্থতার তদন্ত এবং অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
কাটজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের হামলা ইসরায়েলি জনমতকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে বিদেশি সরকারগুলোর সমালোচনাকে অনেক ইসরায়েলি ইহুদিবিদ্বেষ অথবা ইসরায়েলের বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতা হিসেবে দেখেন।
এ কারণে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ইসরায়েলের নির্বাচনে সরাসরি বড় ইস্যু হয়ে উঠছে না, যদিও এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হলে ইউরোপের সঙ্গে সংলাপের পরিবেশ কিছুটা উন্নত হতে পারে। কিন্তু সম্পর্কের গভীর সংকট কাটাতে শুধু নেতৃত্ব বদল যথেষ্ট নয়।
গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ কমানো, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি দেখানো এসব পদক্ষেপের ওপর ইউরোপের আস্থা পুনর্গঠন নির্ভর করবে।
নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফিরলে ইউরোপের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। আর নতুন নেতৃত্ব এলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও দখলদারত্বের প্রশ্নে নীতিগত পরিবর্তন না হলে সম্পর্কের মৌলিক উন্নতি কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন ইসরায়েলের ইউরোপ-নীতিতে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে; কিন্তু দুই পক্ষের সম্পর্ক কতটা পুনরুদ্ধার হবে, তার উত্তর ব্যালটের ফলের চেয়ে বেশি নির্ভর করবে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েল কী বাস্তব পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।
সূত্র: আল জাজিরা।