যেভাবে 'ছাত্র আন্দোলন' বদলে দিলো সার্বিয়ার রাজনীতি

একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে সার্বিয়াজুড়ে দুর্নীতি ও সরকারি অবহেলাবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সড়ক অবরোধ দিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন নিয়মিত বিক্ষোভে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুসিচের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়। প্রায় দুই বছরের আন্দোলনে ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। একপর্যায়ে নির্বাচন হয়ে ওঠে সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই।

রাজধানী বেলগ্রেড, নোভি সাদ ও নিশ শহরে নির্বাচনের ফল ঘিরে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। সমর্থকেরা শহরের কেন্দ্রস্থলে এবং ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, ‘সার্বিয়া স্বাধীন।’ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রতীকী দৃশ্য ছিল বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পিওনিয়ার্স পার্কের তাঁবু শিবির ‘চাচিল্যান্ড’-এর পতন। ভুসিচের সমর্থকদের জন্য ১৮ মাস আগে গড়ে তোলা এই শিবিরটি ছিল সার্বিয়ার সংসদ ভবনের সামনে। নির্বাচনের পর সেখানে ধাতব বেড়া খুলে ফেলা হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘ভুসিচ বিদায় নিচ্ছেন’ স্লোগান দেন।

যেভাবে ছাত্র আন্দোলনে বদলে গেলো সার্বিয়া

আন্দোলনটির কোনো সুস্পষ্ট একক নেতা ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের অনেকেরই রাজনীতিতে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তারপরও ‘স্টুডেন্ট লিস্ট-স্টুডেন্টস উইন’ নামের এই আন্দোলন সরকারবিরোধী ভোটারদের একত্র করতে সক্ষম হয়।

সংসদের ২৫০টি আসনের সব কটিতেই প্রার্থী দিয়েছিল আন্দোলনটি। তবে প্রার্থীদের তালিকায় কোনো শিক্ষার্থী ছিলেন না। আন্দোলনের প্রধান প্রার্থী ইলিয়া সারদানোভিচ একজন হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক। গত সপ্তাহে বেলগ্রেড অভিমুখে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রায় অংশ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে এবং এই আন্দোলনের শক্তিকে থামানো অসম্ভব। বিবিসিকে সারদানোভিচ বলেন, আগের শাসনব্যবস্থা নাগরিকদের কাছ থেকে যেসব সভ্য সামাজিক মূল্যবোধ কেড়ে নিয়েছে, সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। ওই দিন সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের রেলস্টেশনের বাইরের কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। দুর্ঘটনাটি দেশটির ব্যাপক দুর্নীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। সমালোচকেরা রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজে গুরুতর ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান। প্রকল্পটির সঙ্গে ভুসিচের ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির গবেষক হেলেনা ইভানভের মতে, ছাউনি ধসের ঘটনাটি ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের শেষ সীমা। এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকেই এমন একটি আন্দোলনের সূচনা হয়, যা সাধারণ মানুষের আবেগ ও সমর্থনকে একত্র করতে পেরেছিল। তার মতে, বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল আগে এভাবে মানুষের মন জয় করতে পারেনি। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের সড়কে ন্যায়বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। কৃষক, অভিনেতা, বিচারকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যোগ দেন।

আন্দোলনের চাপে ভুসিচের দল এসএনএস স্পষ্টভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যে পদত্যাগ করেন দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। একই বছরের মার্চে বেলগ্রেডে সার্বিয়ার ইতিহাসের বৃহত্তম সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নেতৃত্বহীন এই আন্দোলনকে সংগঠিত করতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ছাত্রসমাবেশ বা ‘প্লেনাম’-এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। ভুসিচ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার আগেই তারা নিজেদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছিলেন।

ইভানভ বলেন, শিক্ষার্থীরা মানুষের আবেগ ও ক্ষোভকে কার্যকর সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দিতে পেরেছেন। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করার কৌশলও শিখেছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্মান মার্শাল ফান্ডের বলকান কর্মসূচির প্রধান গর্দানা দেলিচের ভাষায়, আন্দোলনের মূল বার্তা ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা; আইনকে শাসনের হাতিয়ার হতে না দেওয়া। তার মতে, এবারের নির্বাচন কার্যত একটি গণভোটে পরিণত হয়েছিল। প্রথম দিকে ভুসিচ বিক্ষোভকারীদের ‘সৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে তাদের বিরুদ্ধে সার্বিয়াকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ তোলেন তিনি। পরাজয় স্বীকার করার পরও তার অভিযোগ ছিল, আন্দোলনকারীরা নাম উল্লেখ না করা কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’-এর সমর্থন পেয়েছেন। 

এখন সার্বিয়া চালাবেন কারা?

নির্বাচনের ফলাফলে পরিবর্তন এলেও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব সরাসরি শিক্ষার্থীদের হাতে যাচ্ছে না। কারণ, তারা নিজেরা নির্বাচনে প্রার্থী হননি। আন্দোলনের নেতারা সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কম এমন একদল শিক্ষার্থীকে সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটাররা সহজে গ্রহণ নাও করতে পারেন। আন্দোলনের প্রধান প্রার্থী ইলিয়া সারদানোভিচ নোভি সাদের একজন হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক হলেও তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খুব বেশি আলোচনায় দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে সম্ভাব্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ব্যক্তিও খুব বেশি পরিচিত নন।

‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর তালিকা থেকে অন্তত ১৩৫ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাস্কেটবল তারকা দেজান বোদিরোগা, অভিনেতা তিহোমির স্তানিচ, অপেরা গায়ক নিকোলা মিকিচ এবং সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেজান শোশিচ। তালিকায় রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধ্যাপকও। সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় শোশিচের নাম উঠে এসেছে। অর্থনীতিতে কী ধরনের সংস্কার আনতে চান, সে বিষয়ে তিনি আগেই কথা বলেছেন। সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে।

দুর্নীতি দমন ও গণমাধ্যম সংস্কারের প্রতিশ্রুতি

নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সামনে এখন শিক্ষার্থীদের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এমন প্রতিনিধিদের বেছে নিতে চেয়েছেন, যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবেন এবং কেন সেখানে এসেছেন, তা ভুলে যাবেন না।

১১ দফা কর্মসূচিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশেষ পুলিশ ইউনিট গঠন এবং দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে। বিক্ষোভ দমনে নিয়ম ভেঙেছেন বা সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এমন ব্যক্তিদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

এ ছাড়া দেশটির গণমাধ্যমব্যবস্থার সংস্কার, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় অনুগতদের নিয়োগ বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে আন্দোলনটির। তবে ভুসিচ ও তার দল এসএনএস দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। গণমাধ্যমকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগও তারা নাকচ করেছে।

শিক্ষার্থী ছাড়া কী টিকে থাকবে আন্দোলন?

নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা নিজেরা প্রার্থী না হলেও আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দায় তাদের ওপরই থাকবে। তারা যেসব সাধারণ নাগরিককে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তাদের মাধ্যমে রাজপথের আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিয়ে যেতে চান। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, গত এক বছরে রাজপথে যে সংগ্রাম চালানো হয়েছে, তার একটি অংশ এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব প্রতিনিধিদের দেওয়া হয়েছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ভুসিচ অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীরা সার্বিয়ার দুই বছরের অগ্রযাত্রা নষ্ট করেছেন। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারীরা যত দ্রুত ভাবছেন, তার চেয়েও দ্রুত তাদের পরাজিত করা হবে।

সব মিলিয়ে নোভি সাদের রেলস্টেশনে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থেকে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। তবে দুর্নীতি দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে কি-না, তা নির্ভর করবে নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যক্রম ও আন্দোলনের ওপর শিক্ষার্থীদের নজরদারির ধারাবাহিকতার ওপর।

সূত্র: বিবিসি