সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর নেতা আলেকসান্দার ভুসিচের বিরুদ্ধে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের বড় সাফল্যের দাবি উঠেছে। সংসদ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন ডানপন্থী জনতাবাদী এই নেতা। তাঁর পরাজয়ের ঘোষণার পর দেশটির বিভিন্ন শহরে উল্লাসে মেতে ওঠেন আন্দোলনকারীরা ও তাঁদের সমর্থকেরা।
রোববার রাতে নিজের দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) সদর দপ্তরে ভুসিচ বলেন, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এটা স্পষ্ট যে তাঁরা নির্বাচনে হেরে গেছেন।
সার্বিয়ার নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল, ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে যেতে পারে। ভুসিচের পরাজয় স্বীকারের পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ উদ্যাপন করেন।
দুই বছর ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে আগাম নির্বাচন আয়োজন করা হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সার্বিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের ছাউনির অংশ ধসে ১৬ জন নিহত হন। ঘটনাটি সরকারি অবহেলা ও দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এরপর থেকেই জোরালো হয়ে ওঠে ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলন।
ভুসিচ দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। আইন অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ না থাকায় এবার তিনি নিজের দল এসএনএসকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হন।
দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে একাট্টা ভোটাররা
ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নির্বাচনে সরকারবিরোধী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্র করে। এই আন্দোলনের কোনো একক সুস্পষ্ট নেতা নেই। এর সঙ্গে যুক্ত অনেকেই আগে সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না।
সংসদের ২৫০টি আসনের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ে চিকিৎসক, অভিনেতা, শিক্ষাবিদ ও ক্রীড়াব্যক্তিত্বসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
স্টুডেন্ট লিস্টের প্রধান প্রার্থী ইলিয়া সারদানোভিচ বিবিসি সার্বিয়ানকে বলেন, এবার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দুর্নীতিবিরোধী এই আন্দোলনের লক্ষ্য দেশকে স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত করা।
আন্দোলনকারীদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় অনুগতদের নিয়োগের প্রবণতা রোধ এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি ছিল।
অন্যদিকে, ভুসিচ ও তাঁর দল এসএনএস বারবার দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাস্তায় রাস্তায় বিজয় উদ্যাপন
ভুসিচের পরাজয় স্বীকারের পর সার্বিয়ার বিভিন্ন শহরে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। মানুষ রাস্তায় নেচে-গেয়ে বিজয় উদ্যাপন করেন। গাড়ির হর্ন বাজানো হয়, আতশবাজি ফোটানো হয় এবং ‘বিজয়’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন এলাকা।
বেলগ্রেডে আনন্দ উদ্যাপনের সময় সেলেনা লেবোভিচ রয়টার্সকে বলেন, এই ফল অসাধারণ। তাঁদের অনেকেই কাঁদছিলেন এবং এত সহজে এমন ফল আসবে, তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
স্টুডেন্ট লিস্টের প্রার্থী রাদোমির সাইচিচ বলেন, সার্বিয়ার জনগণ দেখিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের ইচ্ছাশক্তির চেয়ে বড় কোনো বাধা নেই। জনগণ যখন নিজেদের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কোনো শক্তিই চিরকাল তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না।
ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত হওয়া নোভি সাদের কেন্দ্রীয় এলাকাও মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে আনন্দ উদ্যাপনে অংশ নেওয়া ডেভিড ভাসিচ বিবিসি সার্বিয়ানকে বলেন, এখন সবকিছু আরও ভালো হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে ভুসিচের প্রতিশ্রুতি
ভুসিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের কারণে মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি পেনশন ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টা আগের এই হিসাবকে রেকর্ড উপস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
নির্বাচনের দিন সার্বিয়ার বিভিন্ন শহর ও ছোট জনপদের ভোটকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সার্বীয় জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে এমন বিদেশি শহরগুলোতেও ভোট দিতে ভিড় করেন প্রবাসীরা। এসব শহরের মধ্যে ছিল স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানা, জার্মানির মিউনিখ এবং যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও শিকাগো। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভারী বৃষ্টির মধ্যেও ভোটারদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সার্বিয়াজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। রাজধানী বেলগ্রেডে প্রজাতন্ত্রের নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের আশপাশের সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
ভুসিচের পরাজয় স্বীকারের মধ্য দিয়ে সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ছাত্র আন্দোলনের এই সাফল্য বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনে কতটা রূপ নেয় এবং দুর্নীতি দমন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: বিবিসি
ফের ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে তেলের দাম ছাড়াতে পারে ১৫০ ডলার
১০০ গোলের মাইলফলকের চেয়েও দলের জয় গুরুত্বপূর্ণ: এমবাপে
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী’ লিখে পোস্ট করা সেই এসিল্যান্ড প্রত্যাহার