ইরাককেও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে, সতর্কবার্তা ওয়াশিংটনের

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরাকের নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রভাবশালী শিয়া নেতা আম্মার আল-হাকিম। তার এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইরানের ফারসি ভাষার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইরানের কয়েকজন কট্টরপন্থী ব্যবহারকারী ইরাকের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। 

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ইরাকিয়া টেলিভিশনকে দেওয়া আল-হাকিমের একটি সাক্ষাৎকারের অংশ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তিনি বলেন, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে, অন্যথায় ইরাককেও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে—এমন স্পষ্ট সতর্কবার্তা ওয়াশিংটন বাগদাদকে দিয়েছে।

ইরাকের ন্যাশনাল উইজডম মুভমেন্টের প্রধান ও দেশটির সাবেক সুপ্রিম ইসলামিক কাউন্সিলের নেতা আল-হাকিম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মতো পরিস্থিতিতে ইরান অন্যায্য আচরণের শিকার হয়েছে বলে মনে করতে পারে। তবে শুধু আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা দিয়ে কোনো দেশ পরিচালনা করা যায় না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরাকের জনগণ ইরানের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করলেও নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের জনগণকে রক্ষা করাও বাগদাদ সরকারের দায়িত্ব।

আল-হাকিমের বক্তব্যের পর ইরানের কট্টরপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশ তাকে ইরানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং দেশটির সহায়তার প্রতি অকৃতজ্ঞতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। কেউ কেউ ইরাকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপেরও দাবি জানান। ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির উপদেষ্টা এহসান সালেহি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আল-হাকিমের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, তিনি ওয়াশিংটনের কাছে নতি স্বীকার করছেন এবং উপসাগরীয় আরব শাসকদের আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন।

কট্টরপন্থী ভাষ্যকার আলিরেজা তাঘাভিনিয়া আল-হাকিমের বক্তব্যকে এমন এক স্বীকারোক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যাতে বোঝা যায় ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে চলা ছাড়া ইরাকের তেমন কোনো বিকল্প নেই। তিনি লেখেন, ইরানের কারণে রাজনৈতিক অবস্থান পাওয়া একজন শিয়া নেতা আম্মার আল-হাকিম যদি এমন কথা বলেন, তাহলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছ থেকে আর কী প্রত্যাশা করা যায়? চলচ্চিত্র নির্মাতা আলী জারনেগারও আল-হাকিমের সমালোচনা করে তার বক্তব্যকে ‘সম্মান ও অসম্মানের মধ্যকার সীমারেখা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ব্যঙ্গ করে বলেন, ইরাকের তেল যাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি করা না যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তার মন্তব্যে ইরাকের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর কথাও উঠে আসে। এসব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া; এগুলোকে ইরানের সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে আল-হাকিমের বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ইরানের কিছু সংস্কারপন্থী ও অন্য ব্যবহারকারী। তাদের যুক্তি, ইরাকের সরকারকে সবার আগে নিজের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তারা ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে আদর্শিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সমালোচনা করেন। সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মোহসেন সালেহিখাহ আল-হাকিমের বক্তব্যকে সঠিক বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, ইরানও যদি আদর্শিক লক্ষ্য পূরণের জন্য জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন না দিয়ে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিত, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।

আরেকজন ব্যবহারকারী উল্লেখ করেন- আল-হাকিম ইরানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইরাকি রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর একটির নেতৃত্ব দেন। এমনকি ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদারদের মধ্যেও যদি নিজ দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে অন্য ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে তেহরানের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আল-হাকিমের বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের পাশাপাশি ইরান ও ইরাকের মধ্যে আল-শাইব বা চাজাবেহ সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করা নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী ফালেহ আল-জাইদির এক উপদেষ্টা বলেছেন, ইরান থেকে মাদকদ্রব্য ও জাল মুদ্রা পাচার ঠেকাতে সীমান্ত ক্রসিংটি বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাগদাদ তেহরানকে অবহিত করেনি।

সীমান্ত বন্ধের ঘটনায় ইরানের কিছু কট্টরপন্থী ইরাকের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন। ইরানি ব্যবসায়ী বাবাক জাঞ্জানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরাকের চলাচলে আরও বিধিনিষেধ আরোপের আহ্বান জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরাককে অবরোধের প্রকৃত অর্থ ও পরিণতি বুঝতে দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ইরাকের কথিত কৌশলগত ভুলের কারণে দেশটিকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া উচিত, যাতে অন্যরা শিক্ষা নেয়।

ইরাক ও ইরানের মধ্যে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে দুই দেশের স্বার্থ সব সময় এক জায়গায় মেলে না। আল-হাকিমের বক্তব্য সেই দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনেছে: ইরানের সঙ্গে সংহতি বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে ইরাকের অর্থনীতি ও জনগণকে সুরক্ষিত রাখা—বাগদাদের জন্য এই দুই লক্ষ্য কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।