নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণ করবে কারা?

তিন দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে বহুবার ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কার মুখে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রতিবারই নানা রাজনৈতিক সমীকরণে টিকে যাওয়ার নজির রয়েছে তাঁর। তবে এবারের নির্বাচনের ফল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার অবসানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যদিও ইসরায়েলের জটিল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতিতে তাঁর বিদায় এখনো নিশ্চিত নয়।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত পর্যন্ত অধিকাংশ ভোট গণনা শেষে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা স্পষ্ট হয়নি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক দর-কষাকষি চলতে পারে। এই সময় নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে।

ভোট গণনার শেষ পর্যায়ে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে আনুমানিক ২৬টি আসন নিয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে রয়েছে। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। জোটটি মোট ৫৩টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।

অর্থাৎ, নেতানিয়াহু এখনো জয়ী হননি, আবার পুরোপুরি পরাজিতও নন। তাঁর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিকল্প সরকার গঠন ঠেকানো। সেই প্রচেষ্টায় সফল হলে আবারও ক্ষমতায় টিকে যেতে পারেন তিনি।

আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে জটিলতা

সংখ্যার হিসাবে বিরোধী শিবিরের হাতে প্রায় ৬৭টি আসন থাকলেও আদর্শিক, জাতীয় ও ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কারণে তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা কঠিন। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের পক্ষের ইহুদি দলগুলোর আসনসংখ্যা আনুমানিক ৪৮। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনে পৌঁছাতে হলে তাদের দুটি আরব দল—রাআম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন প্রয়োজন হবে। দল দুটি মিলিয়ে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আরব বা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে এবার বেশি ভোট পড়ার পেছনে একটি কারণ হলো গত চার বছর ধরে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকের সময় আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে অপরাধ বেড়ে যাওয়া নিয়ে অসন্তোষ।

রাআম একটি ইসলামপন্থী দল, যার সমর্থকদের বড় অংশ ইসরায়েলের বেদুইন সম্প্রদায়ের। দলটির নেতা মানসুর আব্বাস ২০২১ সালের নির্বাচনের পর ইসরায়েলের সরকারে যোগ দেওয়া প্রথম আরব রাজনীতিক হন।

অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্ট কয়েকটি ছোট দলের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিস্টপন্থী হাদাশ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তাআল এবং জাতীয়তাবাদী বালাদ গোষ্ঠী।

বুধবার বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান বিরোধী জোটের শরিকদের আরব দল দুটিকে নিজেদের শিবিরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইহুদি ও আরব ভোটারদের মধ্যে ‘বর্ণবাদী বিভাজন’ তৈরির অভিযোগ তোলেন।

তবে আইজেনকটের ডানপন্থী দুই মিত্র নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে তাঁরা নতুন কোনো বিবৃতি দেননি।

এদিকে, জয়েন্ট লিস্ট বুধবার জানিয়েছে, তারা রাজনৈতিক সহযোগিতায় প্রস্তুত এবং নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটাতে নিজেদের সাধ্যমতো সবকিছু করবে।

ক্ষমতায় টিকে থাকতে কী করতে পারেন নেতানিয়াহু?

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, নির্বাচনের পর তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো ইহুদি ও আরব দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং তা ঠেকানো। এমন সহযোগিতার ভিত্তিতে সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হলে নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে তাঁর।

ওই সূত্রের দাবি, বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা যাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা না করেন, সে জন্য তাঁদের ব্যক্তিগতভাবেও চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নেতানিয়াহুর।

নির্বাচনী প্রচারে আরব দলগুলোর বিরোধিতা করার পর বুধবার লিকুদ পার্টি অভিযোগ করে, ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আরব দলগুলো ‘নির্বাচন চুরি’ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহুর দলের এই অভিযোগে ট্রাম্পের নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগের সঙ্গে সাদৃশ্য দেখা যায়।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অভিযোগটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের দিন বিভিন্ন দলের করা হাজারো অভিযোগ কমিশন আগেই খারিজ করেছে।

সিএনএনকে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরও বলেছে, বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা ঠেকাতে তিনি ‘সব ধরনের উপায়’ কাজে লাগাতে পারেন। এর মধ্যে ইরানে হামলা চালানো কিংবা ইসরায়েলের রাজনীতিতে তাঁর পক্ষে হস্তক্ষেপ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আহ্বান জানানোর বিষয়ও থাকতে পারে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।

বিরোধী শিবিরের আশঙ্কা, কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে তা ব্যবহার করে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারেন নেতানিয়াহু।

নির্বাচনের আগে ইরানে যৌথ হামলা চালাতে ট্রাম্পের ওপর চাপ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তবে ওয়াশিংটন তখন সে সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকে। এর একটি কারণ হিসেবে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামিরের সতর্কবার্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, হামলা হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, ইরানে হামলার সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে এবং ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

নেতানিয়াহু কী পদক্ষেপ নেবেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় বলে বিরোধী শিবিরের একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, তিনি আবারও উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে না চেয়ে তিনি দেশের ভেতরে ও বাইরে অস্থিরতা তৈরির মতো সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকট মঙ্গলবার রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নেতানিয়াহু এখন কেবল তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী; তাঁর হাতে নতুন কোনো জনসমর্থিত ম্যান্ডেট নেই। ভোটের প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে আইজেনকট বলেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে।

বুধবার ফলাফলের হালনাগাদ চিত্র নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় তিনি ইসরায়েলে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

চূড়ান্ত ফলের পর শুরু হবে সরকার গঠনের লড়াই

ভোটের হিসাব এখনো পরিবর্তিত হতে পারে। বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন অধিকাংশ ব্যালট গণনা শেষ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর গণনা করা হবে বিশেষ খামের ভোট। এসব ভোট দিয়েছেন সেনাসদস্য, কারাবন্দি, হাসপাতালে থাকা রোগী ও কর্মী, বিদেশে দায়িত্ব পালনরত কূটনীতিক এবং প্রতিবন্ধী ভোটাররা।

কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের খামে থাকা ভোটের সংখ্যা ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজারের মধ্যে। এসব ভোটের মাধ্যমে ১০টিরও বেশি আসনের ফল পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভোটগুলো গণনা করা হয়। বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের কথা রয়েছে।

এরপর শুরু হবে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক তৎপরতা। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব হলো নির্বাচনে জয়ী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে তারা সমর্থন করে, তা জানা। এরপর যাঁর নেতৃত্বে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাঁকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি যে সবচেয়ে বড় দলের নেতা হবেন, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

আরব দলগুলো আইজেনকটকে সমর্থন দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের কাছে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য তাঁর পক্ষে বেশি সুপারিশ জমা পড়তে পারে।

সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া প্রার্থী প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। এ সময়ের মধ্যে তাঁকে মন্ত্রিসভার পদ বণ্টন, বাজেট ও নীতিগত বিষয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

তিনি ব্যর্থ হলে অন্য একজন প্রার্থীকে পরবর্তী চার সপ্তাহের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে নেসেটের সদস্যরা স্বল্প সময়ের জন্য বিকল্প প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ পাবেন। সেই প্রক্রিয়াও ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন নির্বাচনের পথে যেতে পারে ইসরায়েল।

তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর একটি সুবিধা রয়েছে। আইজেনকট প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়ে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুকে শুধু সময় পার হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে। নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হলেও কয়েক মাস তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন তিনি।

বিরোধীদের সামনে বিকল্প পথও খোলা

সরকার গঠন করতে না পারলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলগুলো নেসেটের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে নেতানিয়াহুর সরকার পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে এবং বিরোধীদের পক্ষে নতুন আইন প্রস্তাবের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তবে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইজেনকটের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। নেতানিয়াহুর জোটের সদস্যরা তাঁর প্রতি অত্যন্ত অনুগত। ফলে জোটের ভেতর থেকে সদস্য বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম।

অন্যদিকে, আইজেনকটের সম্ভাব্য জোটে আদর্শিক মতপার্থক্য বেশি। সামান্য কোনো ইস্যুতেও জোটে ভাঙন দেখা দিতে পারে, যার পরিণতিতে দেশটিকে আবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট হারজগের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি নেতানিয়াহু ও আইজেনকটকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন।

বুধবার হারজগ বলেন, নতুন করে আরেকটি নির্বাচন এড়াতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো উচিত। এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতে দলীয় নেতাদের ‘খোলা মন’ নিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।

ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কে গঠন করবে, তা নির্ভর করছে চূড়ান্ত ভোটের ফল, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ওপর। ফলে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটবে, নাকি জটিল সমীকরণে আবারও ক্ষমতায় টিকে যাবেন—তার উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

সূত্র: সিএনএন