কোরআন-হাদিসের আলোচনা থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য, ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি—ইরানের বড় শহরগুলোর জুমার খুতবায় উঠে আসে নানা বিষয়। ইমামদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় দেশটির শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থানও। তবে সব মসজিদের খুতবা এক রকম নয়।
ইসলামে জুমার নামাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুতবা। সাধারণভাবে মুসল্লিদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাকওয়া, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু ইরানে জুমার খুতবার ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত। সেখানে ধর্মীয় বক্তব্যের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামরিক সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে বিরোধ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নও গুরুত্ব পায়।
বিশেষ করে তেহরান, কোম, মাশহাদ, তাবরিজসহ বড় শহরগুলোর কেন্দ্রীয় জুমার নামাজে ইমামদের বক্তব্য অনেক সময় সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ইরানের জুমার খুতবা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার রাজনৈতিক যোগাযোগেরও একটি মাধ্যম।
খুতবার কাঠামো: প্রথমে ধর্ম, পরে রাজনীতি
ইরানে প্রচলিত জুমার নামাজে সাধারণত দুটি খুতবা দেওয়া হয়। প্রথম খুতবায় আল্লাহর প্রশংসা, তাকওয়া, কোরআনের আয়াত, হাদিস এবং ধর্মীয়-নৈতিক উপদেশ গুরুত্ব পায়। দ্বিতীয় খুতবায় ধর্মীয় বক্তব্যের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের পরিস্থিতি, সামাজিক সমস্যা, জাতীয় স্বার্থ এবং রাজনৈতিক বিষয় আলোচিত হতে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরানবিষয়ক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশটির প্রচলিত জুমার খুতবার প্রথম অংশে সাধারণত ধর্মীয় বিষয় এবং দ্বিতীয় অংশে রাজনৈতিক বিষয় গুরুত্ব পায়। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুক্রবারের নামাজের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নেতার রাজনৈতিক অবস্থান ও বার্তা দেশজুড়ে পৌঁছে দেওয়ার একটি সংগঠিত ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ইসলামী ফিকাহ অনুযায়ী খুতবার মৌলিক কাঠামো ধর্মীয়। আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানির দপ্তরের প্রকাশিত বিধানেও জুমার আগে দুটি খুতবার কথা বলা হয়েছে। প্রথমটিতে আল্লাহর প্রশংসা, তাকওয়ার উপদেশ ও কোরআনের একটি সূরা পাঠের নির্দেশনা রয়েছে। দ্বিতীয়টিতে আল্লাহর প্রশংসা এবং মহানবী ও ইমামদের প্রতি দরুদ পাঠের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ খুতবার ধর্মীয় ভিত্তি এবং ইরানের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রচলন—দুটি আলাদা বিষয় হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা একই মঞ্চে মিলিত হয়।
কারা নিয়ন্ত্রণ করেন জুমার খুতবা?
ইরানের জুমার খুতবার রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝার জন্য ইমাম নিয়োগের ব্যবস্থাটি জানা জরুরি। দেশটির বড় মসজিদ ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর জুমার নামাজের ইমামদের নিয়োগ বা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবারের নামাজের ইমামদের নিয়োগ ও তদারকিতে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধিদের ভূমিকা রয়েছে। শুক্রবারের নামাজবিষয়ক কেন্দ্রীয় দপ্তর ইমামদের কার্যক্রম তদারক করে এবং ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্যের দিকনির্দেশনা দেয়। প্রাদেশিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলোর ইমামদের ক্ষেত্রেও এই তদারকি কার্যকর।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ছোট এলাকার মসজিদে স্থানীয়ভাবে ইমাম নির্বাচন করা হলেও ধর্মীয় অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সব মসজিদের ইমাম সরাসরি একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পান না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আরেক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছিল, ইরানের ৯০০টির বেশি শহরে সাপ্তাহিক জুমার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ইমামদের রাজনৈতিক আনুগত্য ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি ওই বিশ্লেষণ প্রকাশের সময়কার তথ্য; বর্তমানের হালনাগাদ পরিসংখ্যান হিসেবে একে বিবেচনা করা উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য
ইরানের জুমার খুতবার সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের বিরোধ। বিশেষ করে সামরিক সংঘাতের সময় এ ধরনের বক্তব্য আরও জোরালো হয়।
২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম আহমদ খাতামি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, চাপ প্রয়োগ করে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে আত্মসমর্পণের সঙ্গে তুলনা করে তিনি ইরানকে চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানান।
২০২৬ সালের ১২ জুন ইরানওয়্যারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা সামনে রেখে বিভিন্ন শহরের জুমার খুতবায় ইমামরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপসের বিরোধিতা করেন। তেহরানের ইমাম আহমদ খাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতকে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন। সারি ও কোমের ইমামরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস না করার পক্ষে বক্তব্য দেন।
এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় ও আদর্শিক লড়াইয়ের ভাষায় ব্যাখ্যা করে। তবে ইমামদের বক্তব্যকে সরাসরি সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তাঁরা রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করলেও পররাষ্ট্রনীতি বা সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব তাঁদের নয়।
ফিলিস্তিন ও প্রতিরোধের রাজনীতি
ফিলিস্তিন ইরানের জুমার খুতবার আরেকটি কেন্দ্রীয় বিষয়। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, লেবাননে হামলা, হিজবুল্লাহর ভূমিকা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে ইরানের ধর্মীয় নেতারা নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে প্রায় পাঁচ বছর পর জুমার নামাজে ইমামতি ও খুতবা দেন তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর পাশে একটি রাইফেল রাখা ছিল। তিনি ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে বৈধ ও ন্যায্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন এবং হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
প্রেস টিভির প্রকাশিত খুতবার বিস্তারিত বিবরণে দেখা যায়, খামেনি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতি সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
২০২৬ সালের ১৩ মার্চ তেহরানের জুমার খুতবায় ইমাম আহমদ খাতামি ফিলিস্তিন প্রশ্নকে ইসলামী বিশ্বের প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন। ইরানওয়্যারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও আঞ্চলিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর বক্তব্য দেন এবং প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার কথা বলেন।
এভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি ইরানের খুতবায় শুধু মানবিক বা ধর্মীয় সহমর্মিতার বিষয় হিসেবে নয়, বরং দেশটির আঞ্চলিক রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবেও উপস্থাপিত হয়।
যুদ্ধের সময় খুতবায় উঠে আসে সামরিক শক্তির বার্তা
যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংকটের সময় ইরানের জুমার খুতবা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় মনোবল, সামরিক সক্ষমতা এবং প্রতিরোধের বার্তা প্রচারের মঞ্চে পরিণত হয়।
প্রেস টিভির ২০২৫ সালের ২৭ জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম সাইয়্যেদ মোহাম্মদ হাসান আবুতোরাবিফার্দ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর ইরানের অবস্থানকে নতুন শক্তির সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্যে ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং জাতীয় ঐক্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
২০২৬ সালের ২৯ মে প্রেস টিভির আরেক প্রতিবেদনে তেহরানের অন্তর্বর্তী জুমার ইমাম আবুতোরাবিফার্দের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাব কমে আসছে বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাকে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং প্রতিরোধক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
অন্যদিকে, ইরানওয়্যারের ২২ মে ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বিভিন্ন শহরের ইমামদের আরও কঠোর বক্তব্যের বিবরণ পাওয়া যায়। তেহরান, তাবরিজ, মাশহাদ, আবাদান ও আহভাজের ইমামরা সম্ভাব্য নতুন হামলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হুঁশিয়ার করেন। কয়েকজন ইমাম আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন।
এসব বক্তব্য ইরানের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে সামরিক প্রতিরোধের ধারণা কতটা গুরুত্ব পায়, তার একটি চিত্র তুলে ধরে। তবে এগুলো সংশ্লিষ্ট ইমামদের বক্তব্য; প্রতিটি বক্তব্যকে ইরানের সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
শুধু বাইরের শত্রু নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আলোচনায় আসে
ইরানের জুমার খুতবায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গই থাকে না। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আন্দোলন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিও আলোচনায় উঠে আসে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের জুমার ইমাম আহমদ খাতামি বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের বিদেশি শক্তির সহযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ছিল।
এ ধরনের বক্তব্য দেখায়, ইরানের জুমার খুতবা কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করার মঞ্চ হয়ে ওঠে। তবে এসব বক্তব্য নিয়ে ইরানের ভেতরে জনমত কতটা একমত, তা শুধু খুতবার বিবরণ থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
অর্থনীতি, সামাজিক সংকট ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন
খুতবায় অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়ও উঠে আসে। সব ইমাম যে এসব বিষয়ে একই গুরুত্ব দেন, তা নয়। তবে রাষ্ট্রীয় নীতির পাশাপাশি মানুষের বাস্তব সমস্যা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার নজির রয়েছে।
ইরানওয়্যারের ২০২৬ সালের ২২ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মাশহাদের ইমাম সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতির কথা বলেন। একই প্রতিবেদনে আহভাজের ইমামের বক্তব্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রসঙ্গের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়ও উঠে আসে।
অর্থাৎ খুতবার রাজনৈতিক আলোচনায় কখনো আন্তর্জাতিক সংঘাত, কখনো জাতীয় নিরাপত্তা, আবার কখনো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকট জায়গা পায়।
সব মসজিদের খুতবা কি একই রকম?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তেহরানের কেন্দ্রীয় জুমার নামাজ বা প্রাদেশিক রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলোর খুতবা সাধারণত জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। কিন্তু প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মসজিদে একই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয়—এমন প্রমাণ নেই।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেশটির মসজিদ ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বাসিজের মতো সংগঠনের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে মসজিদে নিয়মিত উপস্থিতি ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের কথা উঠে আসে।
এ ছাড়া ইরানের সব নাগরিক যে জুমার নামাজে অংশ নেন বা ইমামদের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে একমত—এমন ধারণাও সঠিক নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতামত এক বিষয় নয়।
খুতবা: ধর্মীয় মঞ্চ, নাকি রাষ্ট্রীয় বার্তার মাধ্যম?
ইরানের জুমার খুতবার দিকে তাকালে দুটি স্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমটি হলো ইসলামী ধর্মীয় আচার—কোরআন, হাদিস, তাকওয়া, নৈতিকতা ও মুসল্লিদের উপদেশ। দ্বিতীয়টি হলো দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতা—রাষ্ট্রীয় আদর্শ, জাতীয় ঐক্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিরোধিতা, ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন, সামরিক প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
এই দুই স্তরের মধ্যে সম্পর্কই ইরানের জুমার খুতবাকে অন্য অনেক দেশের প্রচলিত জুমার বয়ান থেকে আলাদা করে তুলেছে। দেশটির শাসনব্যবস্থায় ধর্মীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় শুক্রবারের মিম্বর রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তবে এই ব্যবস্থার মূল্যায়নে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সাধারণত ইমামদের বক্তব্যকে দেশের ঐক্য, প্রতিরোধ ও জাতীয় শক্তির ভাষায় তুলে ধরে। অন্যদিকে, ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও ইরানওয়্যারের মতো সংবাদমাধ্যম খুতবার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, কঠোর বক্তব্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার দিকটি সামনে আনে। তাই নির্ভরযোগ্য চিত্র পেতে রাষ্ট্রীয় ও স্বাধীন—দুই ধরনের সূত্র মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ইরানের জুমার খুতবা শুধু ধর্মীয় উপদেশের অনুষ্ঠান নয়; দেশটির ধর্মীয় কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংযোগস্থল। মসজিদের মিম্বরে উচ্চারিত বক্তব্য কখনো মুসল্লিদের নৈতিক শিক্ষা দেয়, কখনো জাতীয় সংকটে ঐক্যের আহ্বান জানায়, আবার কখনো ওয়াশিংটন, তেল আবিব কিংবা দেশের অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের উদ্দেশে রাজনৈতিক বার্তা পাঠায়।