সরকারি নিয়োগে প্রার্থীদের চরিত্র যাচাইয়ের নিয়ম কঠোর করেছে উত্তর প্রদেশ সরকার। হিংসাত্মক উপায়ে প্রচলিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সরকারি চাকরির অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন প্রার্থীরা। বিরোধীদের অভিযোগ, আন্দোলনের অধিকার খর্ব করতেই এই উদ্যোগ।
ভারতের উত্তর প্রদেশে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বিধি জারি করেছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, হিংসাত্মক উপায়ে সরকার পরিবর্তন বা প্রচলিত ব্যবস্থা বদলের আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিরা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন।
এ লক্ষ্যে সরকারি নিয়োগের আগে প্রার্থীদের চরিত্র যাচাই বা ‘ক্যারেক্টর ভেরিফিকেশন’ প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হয়েছে। এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ করে গত বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকারের নিয়োগ ও কর্মীবর্গ দপ্তর এ-সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করে। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের পাশাপাশি পৌরসভা, পৌর পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম কার্যকর হবে।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যেসব সংগঠনের ঘোষিত লক্ষ্য হিংসাত্মক উপায়ে প্রচলিত ব্যবস্থা পরিবর্তন করা, সেসব সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা সরকারি চাকরির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন।
রাজ্য সরকারের নিয়োগ ও কর্মীবর্গ দপ্তরের মুখ্য সচিব এম দেবরাজের জারি করা নির্দেশনায় বয়স ও সময়সীমার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ২১ বছর বয়স পূর্ণ করার পর এবং চরিত্র যাচাইয়ের তারিখের আগের তিন বছরের মধ্যে এ ধরনের আন্দোলন বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট তৎপরতার সঙ্গে এখনো সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত বলে ধরে নেওয়া হতে পারে।
তবে ওই তিন বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ ও মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে—এমন অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর আবেদন পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে।
সরকারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে না। কারও বিরুদ্ধে এফআইআর থাকলেই বা কোনো মামলার তদন্ত চলমান থাকলেই তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়োগের অযোগ্য বিবেচনা করা হবে না।
যেসব ব্যক্তি আদালতে বেকসুর খালাস পেয়েছেন, আপস-মীমাংসার মাধ্যমে যাঁদের মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে কিংবা যাঁদের বিরুদ্ধে কিশোর বিচার আইনে মামলা চলছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্যতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
চরিত্র যাচাইয়ের প্রতিবেদন পেতে দেরি হলে প্রার্থীর নিয়োগপত্র আটকে রাখা হবে না। সে ক্ষেত্রে স্বঘোষণাপত্র বা ‘সেলফ ডিক্লারেশন’ জমা দিয়ে সাময়িক নিয়োগপত্র নেওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে পরে চরিত্র যাচাইয়ের প্রতিবেদনে বিরূপ তথ্য পাওয়া গেলে অথবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়োগ নেওয়ার প্রমাণ মিললে নিয়োগ বাতিল করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
নতুন নির্দেশিকা জারির আগে যাঁরা সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের চরিত্র নতুন করে যাচাই করা হবে না। তবে প্রয়োজন মনে করলে সরকারি কর্মকর্তা বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিবেদন পাওয়া গেলে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে নির্দেশিকায়।
নতুন বিধি জারির পরপরই উত্তর প্রদেশে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও কংগ্রেসের অভিযোগ, যোগী সরকার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মতো আচরণ করছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের সরকারি চাকরি না দেওয়ার ভয় দেখিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিজেপিবিরোধী আন্দোলনকে ‘নৈরাজ্য’ ও ‘অরাজকতা’ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছে ক্ষমতাসীন দলটি। ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি নিয়েছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি দলও এ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা বলেছেন। কেউ কেউ একে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
বিজেপি এসব বক্তব্যকে সামনে এনে অভিযোগ করছে, আন্দোলনকারীরা হিংসাত্মক পন্থায় সরকারের পতন ঘটাতে চাইছেন। নতুন নির্দেশিকায় হিংসাত্মক উপায়ে প্রচলিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অযোগ্য ঘোষণার বিধানকে সেই রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিরোধীরা।
বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট আগামী ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিরোধীদের ধারণা, উত্তর প্রদেশের তরুণদের ওই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করাও নতুন নির্দেশিকা জারির অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি বক্তব্য বা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
নতুন নির্দেশিকা জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর প্রদেশের বিধান পরিষদের ১১টি আসনের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। ফলাফলে সমাজবাদী পার্টি আগের তুলনায় দুটি আসন বেশি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকা বারানসিতে ভোট হওয়া দুটি আসনেই বিজেপি প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন; জয় পেয়েছেন এসপি প্রার্থীরা।
এবার চার রাজ্যের বিধান পরিষদের মোট ২৮টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব আসনের ভোটার ছিলেন স্নাতক ও শিক্ষক শ্রেণির মানুষ। উত্তর প্রদেশের ফলাফলকে ঘিরে রাজ্যের শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন কমছে এবং বিরোধীদের সমর্থন বাড়ছে—এমন রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নতুন বিধি বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে কতটা সুবিধাজনক হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস নতুন নির্দেশিকাকে ‘কালা বিধি’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র সমালোচনা করেছে।
এসপির বক্তব্য, ব্রিটিশ শাসনামলেও আন্দোলনকারীদের দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে এ ধরনের ফরমান জারি করা হতো। স্বাধীন ভারতে সংবিধান নাগরিকদের আন্দোলনের অধিকার দিয়েছে। সরকারি চাকরি না দেওয়ার ভয় দেখিয়ে সেই অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করছে যোগী সরকার।
অন্যদিকে কংগ্রেসের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধিতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিয়ে বিজেপি আতঙ্কিত। সে কারণেই এ ধরনের বিধি জারি করে নাগরিকদের অধিকার সংকুচিত করতে চাইছে দলটি।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে কাউকে চাকরির অযোগ্য করা হবে না। তবে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে যুক্ত সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
নতুন বিধি ঘিরে এখন উত্তর প্রদেশে মূল বিতর্ক—সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও চরিত্র যাচাইয়ের সীমা কোথায় শেষ হবে, আর নাগরিকের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার কোথা থেকে শুরু হবে।