ইসরায়েলে ‘ইসলামায়নের চেষ্টা’ চলছে: লিকুদ পার্টি

ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের রেকর্ডসংখ্যক ভোটদান এবং নির্বাচনী সাফল্যকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি অভিযোগ করেছে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটের মাধ্যমে ইসরায়েলের নির্বাচন ‘ছিনতাই’ করা হয়েছে। তাদের দাবি, বিদেশি শক্তি অর্থায়নের মাধ্যমে ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়ে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।

তবে নির্বাচন কর্মকর্তারা এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো ভিত্তি পাননি বলে জানিয়েছেন। বিরোধী রাজনীতিকরাও অভিযোগটিকে নির্বাচনের ফল অগ্রহণযোগ্য করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে কাতার অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর ও বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে লিকুদ পার্টি ইসরায়েলে ‘ইসলামায়নের চেষ্টা’ চলছে বলে সতর্ক করে। দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের খবর প্রকাশের পর দলটি এ বক্তব্য দেয়। নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার দাবি, কাতার, তুরস্কসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের নির্বাচন ছিনতাই করেছে।

ফিলিস্তিনি দলগুলোর ১৯ আসন, জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

ইসরায়েলের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দুটি পৃথক রাজনৈতিক জোট মোট ১৯টি আসন পেয়েছে। ফলে সরকার গঠনের আলোচনা ও সংসদীয় সমীকরণে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই ফলাফলকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত। নেতানিয়াহুর বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকোট সরকার গঠনের জন্য ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে লিকুদ পার্টি তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি অর্থায়ন ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ সামনে এনেছে।

ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলো অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, নির্বাচনে নিজেদের নাগরিকদের অংশগ্রহণকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নেতানিয়াহু ও তার রাজনৈতিক সহযোগীরা গোয়েন্দা তদন্তকে ব্যবহার করছেন। জয়েন্ট লিস্ট এক বিবৃতিতে বলেছে, ডানপন্থী রাজনীতিকদের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে তাদের আর আত্মপক্ষ সমর্থন করার প্রয়োজন নেই।

রাম পার্টির নেতা মানসুর আব্বাসও অভিযোগে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। তিনি তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, নেতানিয়াহুর প্রচার ও উসকানির বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট, তদন্তে কিছু পাওয়া যাবে না, কারণ এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ইসরায়েলের কয়েকজন রাজনীতিক ও সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ, কাতার ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে অর্থায়ন করেছে। তবে কাতার এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ইসরায়েলের কিছু রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের বক্তব্যে বারবার কাতারের নাম টেনে আনার প্রবণতা দেশটির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিরই প্রকাশ।

তিনি বলেন, ‘কাতারকে কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিকের রাজনৈতিক ব্যর্থতার বলির পাঁঠা বানানো উচিত নয়।’ দোহার ভাষায়, অভিযোগগুলো ‘হাস্যকর ও বিপজ্জনক’। কাতার বলছে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের দায় অন্য দেশের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তদন্তের সূত্রপাত যেভাবে

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান নোয়াম সোলবার্গ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়। তবে চিঠিতে সন্দেহভাজন বিদেশি শক্তির নাম বা অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাতে বলা হয়, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে কাতার অর্থায়ন করেছে এমন অভিযোগ নির্বাচন কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে একই সংবাদমাধ্যমের সূত্রগুলো অভিযোগের ব্যাপ্তি অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে। ওয়াইনেট ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কানও অজ্ঞাতনামা কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, বিষয়টি যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তবে অভিযোগের ব্যাপ্তি তার তুলনায় অনেক ছোট।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির মহাপরিচালক ডিন লিভনেহ বলেছেন, নির্বাচন ছিনতাইয়ের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক প্রতিবেদনেরও বাস্তব ভিত্তি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। এক পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি জানান, নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগকে এখন পর্যন্ত ভিত্তিহীন প্রচারণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আইজেনকোটের অভিযোগ: ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিকল্পিত প্রচার

ইসরায়েলের প্রধান বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকোটও লিকুদ পার্টির অভিযোগের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, নেতানিয়াহু ও লিকুদ পার্টি নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রতিপন্ন করার জন্য সমন্বিত প্রচারণা শুরু করেছে। আইজেনকোটের সামনে এখন বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন- নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন নেওয়া হবে কি-না।

এই সম্ভাবনা ঠেকাতে লিকুদ পার্টি জায়নবাদী বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন রাম ও জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় না যায়। দলটির বিবৃতিতে দাবি করা হয়, বিদেশি শক্তি অর্থের বিনিময়ে নেসেটে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। তাই ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভোটে নেসেটের স্পিকার পরিবর্তন কিংবা তাদের সমর্থনে নতুন সরকার গঠন ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক হবে।

সংসদের স্পিকার পরিবর্তন নিয়েও বিতর্ক

এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সংসদের স্পিকার আমির ওহানাকে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। জয়েন্ট লিস্টের সদস্য আহমদ তিবি ইসরায়েলি আর্মি রেডিওকে জানিয়েছেন, বিরোধী জোটের প্রতিনিধিরা স্পিকার পরিবর্তনের বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে কোন দলের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে কথা বলেছেন, তা তিনি প্রকাশ করেননি।

তিবি বলেন, স্পিকার পরিবর্তনের পক্ষে তারা। নির্বাচনের পর বিরোধী দলের এমন উদ্যোগ নেওয়া স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। লিকুদ পার্টি অবশ্য এই উদ্যোগকে ফিলিস্তিনি দলগুলোর ভোটের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে এবং এটিকে বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে।

গ্রেপ্তার, ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও অস্ত্র রাখার আহ্বান

লিকুদের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক মিত্ররা আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির শিন বেতকে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলের নেতাদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর সহযোগী সংগঠনের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ধর্মীয় জায়নবাদী দলের নেতা বেজালেল স্মোত্রিচের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বসতি স্থাপনপন্থী রাজনীতিক মোশে ফেইগলিন নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, কাতারকে ইসরায়েলের নেসেট নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া যায় না।

তিনি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনেরও আহ্বান জানান। বেন-গভিরের দল ওতজমা ইয়েহুদিতের আইনপ্রণেতা ইয়িৎসহাক ক্রয়জার আরও এক ধাপ এগিয়ে ইসরায়েলিদের অস্ত্র বহনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার আশঙ্কা, ফিলিস্তিনি নাগরিকরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তে পারেন। তবে এই আশঙ্কার পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্ক ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। একদিকে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলো নির্বাচনে পাওয়া আসনকে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ফল হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর দল তাদের নির্বাচনী প্রভাবকে বিদেশি হস্তক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করছে।

কাতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বিরোধী নেতা আইজেনকোট এটিকে নির্বাচনের ফল অগ্রহণযোগ্য করার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন। নির্বাচন কমিটির কর্মকর্তারাও নির্বাচনে জালিয়াতি বা ফল ছিনতাইয়ের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু কে সরকার গঠন করবে, তা নয়; বরং নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে ইসরায়েলের দলগুলো কতটা গ্রহণ করবে, সেটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই