ইরানের সাত শর্ত মেনে না নিলে আলোচনায় অগ্রগতি হবে না: গালিবাফ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১২ পিএম

ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনায় কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তাঁর দাবি, ইরানের শর্তগুলো মধ্যস্থতাকারীদের কাছে বারবার এবং স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগ কিংবা প্রলোভন দেখানোর কৌশল তেহরানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, ‘ইরানের শর্তগুলো মধ্যস্থতাকারীদের কাছে বারবার ও স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। চাপ ও প্রলোভনের নীতি ইরানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। ইরানের সাতটি শর্তে সম্মতি হলেই কেবল অগ্রগতি সম্ভব।’

তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন কয়েক মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চলছে। তবে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার শর্ত, অগ্রাধিকারের বিষয় এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

গালিবাফ তাঁর সর্বশেষ এক্স পোস্টে সাতটি শর্তের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তবে ইরানের আগের বক্তব্য ও কূটনৈতিক আলোচনায় উঠে আসা দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা বৈদেশিক সম্পদ মুক্ত করা এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

এ ছাড়া ইরানের ওপর সামরিক চাপ ও হামলা বন্ধ, আঞ্চলিক সংঘাতে উত্তেজনা কমানো এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

তবে এসব দাবির সবগুলোকে গালিবাফের সর্বশেষ ঘোষিত সাত শর্তের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ তাঁর সাম্প্রতিক পোস্টে শর্তগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।

ইরানের দৃষ্টিতে, কেবল যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক সমঝোতা যথেষ্ট নয়। দেশটির ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রেখে আলোচনায় বসার প্রস্তাবকে তেহরান গ্রহণ করতে চাইছে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হলো কোন বিষয়টি আগে সমাধান হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ।

ওয়াশিংটন শুরুতেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এবং এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চায়। অন্যদিকে তেহরানের অবস্থান, আগে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে। এরপর পারমাণবিকসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।

রয়টার্সের ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার উদ্যোগ এগিয়ে নিতে শুক্রবার আবার তেহরানে গেছেন। এর আগে কাতার একটি খসড়া শান্তি প্রস্তাব ইরানের কাছে উপস্থাপন করেছিল। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রস্তাবটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।

ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ এখনো কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাইয়ের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভ্যান্সের বার্তার বিষয়বস্তু ছিল ইরানে চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে সহায়তা করা, শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা নয়। অন্যদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বার্তাটিকে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান এখনো ওই বার্তার জবাব দেয়নি। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটির নির্ধারিত শর্তের বাইরে কোনো উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে প্রণালিটির নিরাপত্তা ও চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি শুধু দুই দেশের নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান এর আগে জানিয়েছে, তাদের সাত শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি হবে না। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তেহরান একই সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাবে।

ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তাদের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরছে।

চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধ এবং হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল নিয়ে বিরোধ সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

গালিবাফের সর্বশেষ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইরান আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে নিজেদের শর্তকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তেহরান মনে করছে, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক চাপ বজায় রেখে কোনো স্থায়ী সমঝোতা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নির্দিষ্ট সমাধান ছাড়া বৃহত্তর চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন।

কাতারের নতুন মধ্যস্থতা উদ্যোগ এই অচলাবস্থা কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে কতটা সরে আসতে রাজি, তার ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ আলোচনার সাফল্য। আপাতত গালিবাফের বার্তা—ইরানের সাত শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আলোচনায় অগ্রগতির পথ খুলবে না।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত