তদন্তের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ ও শুল্কনীতির প্রভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ মার্কিন ভোটাররা। নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তদন্ত ও অভিশংসনের উদ্যোগসহ নানা রাজনৈতিক চাপে পড়তে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে (মিডটার্ম) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। এর ফলাফল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথ এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিবিসির উত্তর আমেরিকা সম্পাদক সারাহ স্মিথের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ জীবনযাত্রার ব্যয়। খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের জনসমর্থনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এই পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান পার্টি ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছে। দলটি আইওয়া ও কানসাসের মতো এলাকায় প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত নিরাপদ আসনেও বাড়তি প্রচার ব্যয় নির্বাচনে রিপাবলিকানদের উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৩ ডলার ৭৫ সেন্ট। গত সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৬ ডলার ৫২ সেন্টে পৌঁছায়।

একই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসনের বিস্তৃত শুল্কনীতি না থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও কম হতে পারত।

আইওয়া, টেক্সাস, ওহাইও ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে এসব অর্থনৈতিক চাপ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী অবস্থান দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেখানেও ডেমোক্র্যাটদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প নিজে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী নন। কিন্তু প্রচারণার বিভিন্ন সমাবেশে ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, তাঁকে যেন ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করে ভোট দেওয়া হয়।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একসময় রিপাবলিকান প্রার্থীদের কাছে ট্রাম্পের সমর্থন ছিল বড় নির্বাচনী শক্তি। কিন্তু ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের কারণে সেই অবস্থান এখন প্রশ্নের মুখে।

আইওয়ার কয়েকজন রিপাবলিকান ভোটারও বিবিসিকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর ভূমিকা তাঁদের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। তবে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ থাকলেই তাঁরা ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিবিসির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নির্বাচনের আগের একাধিক জরিপে ট্রাম্পের জনসমর্থন প্রায় ৩৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এনবিসির জাতীয় জরিপসহ কয়েকটি জরিপে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব মাত্র ২৯ শতাংশ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমলেও ডেমোক্র্যাটরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটারদের সমর্থন পাচ্ছেন না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসে তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবেন।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের কয়েকজন মন্ত্রিসভার সদস্যের বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগও নিতে পারেন। ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আইন ও নীতিগত উদ্যোগ আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও পাবে বিরোধী দল। যদিও ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আশাবাদ থাকলেও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন তুলনামূলক কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।

এবার সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে। মিশিগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন হারালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তাদের পাঁচটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।

মিশিগান, টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া, মেইন, আলাস্কা ও নর্থ ক্যারোলাইনার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোকে এবারের সিনেট নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু ট্রাম্পের জন্য নয়, ডেমোক্র্যাটদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের ফলাফল থেকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দলটি নিজেদের শক্তি, দুর্বলতা ও ভোটারদের প্রত্যাশা সম্পর্কে ধারণা পাবে।

টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন, গ্রামীণ ভোটারদের কতটা কাছে টানতে পারেন এবং দলটির নতুন নেতৃত্ব কতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তরও মিলতে পারে এবারের নির্বাচনে।

তবে জরিপের ফলাফল নিয়ে সতর্ক থাকার কথাও বলেছে বিবিসি। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অনেক জরিপ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেশি দেখিয়েছে এবং ট্রাম্পের ভোটের হিসাব কম ধরেছে। তাই শেষ পর্যন্ত ফলাফল জরিপের সঙ্গে কতটা মিলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে ট্রাম্প কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি আগেও নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ভোট গণনার সময় বা ফল ঘোষণার পর আবারও এমন অবস্থান নেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য তাঁর নীতি ও নেতৃত্বের ওপর ভোটারদের মূল্যায়ন পাওয়ার সুযোগ। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তাঁর প্রশাসন রাজনৈতিক চাপ ও তদন্তের মুখে পড়তে পারে। আর রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দুই বছরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি।