যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর ইরান নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের কঠিন সমীকরণে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানে আবারও সামরিক হামলা শুরু করা, তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো, নাকি নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রাখা—এই তিনটি পথ বিবেচনা করছেন তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস বুধবার (৪ নভেম্বর) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে বলে ট্রাম্প স্বীকার করলেও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারাও এ বিষয়ে নিশ্চিত নন যে তিনি কোন পথে এগোবেন।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রশাসনের ভেতরে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে একটি প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে। এ অবস্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি মনে করেন, নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু না করে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভ্যান্স ব্যক্তিগত আলোচনায় ইরান সম্পর্কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল্যায়নের সমালোচনা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ইরানের সঙ্গে অজনপ্রিয় যুদ্ধ রিপাবলিকানদের নির্বাচনে ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
তবে ট্রাম্প এর আগে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর দিকেই ঝুঁকেছিলেন। এমনকি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে হামলার কথা বিবেচনা করেছিলেন তিনি। নেতানিয়াহুও তাঁকে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যাক্সিওসের বরাতে জানা গেছে, ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এ জন্য মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা পাঠানোর প্রক্রিয়াও চলছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন একটি খসড়া চুক্তির জন্য। এই চুক্তির উদ্দেশ্য নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া ঠেকানো এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু করার পথ তৈরি করা।
অর্থাৎ সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা একই সময়ে এগোচ্ছে। তবে চুক্তির শর্ত কিংবা দুই পক্ষের সম্মতির বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের আরেকটি অংশ আপাতত যুদ্ধ শুরু না করে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পক্ষে। সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মার্কিন নৌ অবরোধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন।
তাঁদের ধারণা, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপ বজায় রাখলে ইরানকে আলোচনায় আরও ছাড় দিতে বাধ্য করা যেতে পারে। ফলে ট্রাম্পের সামনে সামরিক অভিযান ও সমঝোতার পাশাপাশি চাপ অব্যাহত রাখার বিকল্পটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়কে নিজেদের কৌশলগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরানি জাতি যুদ্ধক্ষেত্র ও হরমুজে ট্রাম্পকে কৌশলগত পরাজয় দিয়েছে—আর ওয়াশিংটনে দিয়েছে রাজনৈতিক পরাজয়।’
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারী কূটনীতিক, ট্রাম্পের উপদেষ্টা এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইরানের এমন বিজয়োল্লাস ট্রাম্পকে আবার সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁদের মতে, তেহরান যদি মার্কিন নির্বাচনী দুর্বলতাকে সামরিক দুর্বলতা হিসেবে ধরে নিয়ে আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে সমঝোতা আরও কঠিন হতে পারে।
বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং তা রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতিতে ভূমিকা রেখেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের এ মূল্যায়নকে তিনি ‘অনেকাংশে সত্য’ বলেও মন্তব্য করেন।
তবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত নন তিনি। ট্রাম্প বলেন, আবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন। তাঁর যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না।
যুদ্ধ কখন শেষ হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যখন আমি চাইব, তখনই। তবে কাজটি সঠিকভাবে শেষ করতে হবে, কারণ তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না।’
ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি বিকল্প: নতুন করে সামরিক অভিযান, কাতারের মধ্যস্থতায় সমঝোতা, অথবা নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রাখা। প্রতিটি পথেরই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি রয়েছে।
নতুন হামলা হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সমঝোতা করতে গেলে দুই পক্ষের অবস্থান ও শর্তের ব্যবধান দূর করতে হবে। আর বর্তমান অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বজায় থাকতে পারে।
সুতরাং মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় ইরান নীতিতে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করলেও ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক আলোচনা—দুই প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলায় আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।