যুদ্ধবিরোধী ভোটে ট্রাম্পের পরাজয়, এবার থামবে কী ইরান যুদ্ধ?

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের বড় পরাজয় শুধু কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়নি, ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ বাড়বে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ভোটারদের বার্তা উপেক্ষা করা তাঁর জন্য কঠিন হতে পারে।

কিন্তু নির্বাচনের ফল কি ইরান যুদ্ধ বন্ধ করে দেবে? মধ্যপ্রাচ্যে কি স্থায়ী শান্তির পথ খুলবে? নাকি রাজনৈতিক পরাজয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ট্রাম্প উল্টো আরও সামরিক পদক্ষেপ নেবেন?

৫ নভেম্বর প্রকাশিত অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী পরাজয়ের পর ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ—ইরানে আবার সামরিক হামলা, তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা অথবা নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখা। প্রতিটি পথেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি।

নির্বাচনের ফলকে ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের রায় হিসেবে দেখছে তেহরান। ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

তবে বিষয়টি এত সরল নয়। মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষের পেছনে শুধু ইরান যুদ্ধ ছিল না; মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, শুল্কনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কিন্তু যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব যে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতির অন্যতম কারণ, তা ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন। নির্বাচনের পর তিনি বলেছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছিল এবং তা তাঁর দলের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার জন্য সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল এবং পরিস্থিতি একই হলে তিনি আবারও তা করতেন। 

এখানেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংকট। যুদ্ধ চালিয়ে গেলে অর্থনৈতিক চাপ ও জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে। আবার যুদ্ধ বন্ধ করলে সেটিকে নিজের সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোর ঝুঁকি রয়েছে।

নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হলো, ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক ব্যয় এবং সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুন কংগ্রেস ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা কয়েকটি পথে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন।

প্রথমত, ইরান যুদ্ধের ব্যয় ও সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে শুনানি করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, প্রতিরক্ষা বাজেট ও সামরিক অর্থায়নে শর্ত আরোপের চেষ্টা করতে পারবেন। তৃতীয়ত, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবেন। সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন কি না, সেই প্রশ্নেও নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।

রয়টার্সের ৪ নভেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানো, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে রাখা এবং যুদ্ধের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশাসনের কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য চাওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে পারেন।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারবেন না। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের হাতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা বাজেট, কমিটির শুনানি, তদন্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাঁর সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলতে পারবেন। প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করার মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের নেই। 

অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ বন্ধের রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপ বাড়াতে পারবেন, কিন্তু নির্বাচনের ফলের পরদিনই সামরিক অভিযান বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের হাতে চলে আসেনি।

ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ

১. আবার সামরিক হামলা

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পক্ষে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের যুক্তি, ইরানকে বিশ্বাস করে চুক্তি করা কঠিন এবং সামরিক লক্ষ্য অর্জনে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নতুন করে বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক সক্ষমতাও পাঠানো হচ্ছে। অর্থাৎ নির্বাচনী পরাজয়ের পরও সামরিক বিকল্পটি বাতিল করেনি ওয়াশিংটন। 

ট্রাম্পের জন্য এই পথের ঝুঁকি হলো, নতুন হামলা যুদ্ধের পরিধি বাড়াতে পারে, জ্বালানির দাম আবার বাড়াতে পারে এবং দেশে তাঁর দলের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও তীব্র করতে পারে।

২. কূটনৈতিক সমঝোতা

দ্বিতীয় পথটি হলো ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই অবস্থানের অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর মতে, যুদ্ধই রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের অন্যতম কারণ। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যান্স ব্যক্তিগতভাবেও ইরান বিষয়ে নেতানিয়াহুর অবস্থানের সমালোচনা করেছেন।

কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি খসড়া সমঝোতা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। লক্ষ্য হলো নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানো এবং সরাসরি আলোচনা পুনরায় চালু করা।

এর আগে ২ নভেম্বর অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তিন দিনের একটি আস্থাবর্ধক পদক্ষেপের খসড়া তৈরি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতামত নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, ইরানকে আবার বোমা হামলা করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর তাড়াহুড়ো নেই। 

কিন্তু সমঝোতার পথে বড় বাধা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম মজুত ও পরিদর্শন নিয়ে কঠোর শর্ত দিতে চায়। অন্যদিকে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়ার মতো দাবি তুলেছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার প্রশ্নও আলোচনাকে জটিল করছে।

আনাদোলু এজেন্সির ৪ নভেম্বরের বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন ক্যালাব্রেসি বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। তাঁর মতে, ট্রাম্প একদিকে সমঝোতার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে সামরিক বিকল্পও খোলা রাখছেন।

৩. যুদ্ধ নয়, সমঝোতাও নয়—অর্থনৈতিক চাপ

তৃতীয় পথটি হলো সরাসরি হামলা না চালিয়ে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখা।

অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টসহ ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টা এই কৌশলের পক্ষে। তাঁদের ধারণা, দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখলে ইরান শেষ পর্যন্ত আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।

কিন্তু এই কৌশলও দ্রুত ফল দেবে না। একই সঙ্গে ইরান যদি অবরোধের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, তাহলে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে সংঘাত তৈরি হতে পারে। 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নীতিতে ট্রাম্পের স্বাধীনতা কমতে পারে। ফলে তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রেসিডেন্সির উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারেন—এমন সম্ভাবনার কথাও সিএফআরের বিশ্লেষকেরা তুলেছেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প অবশ্যই যুদ্ধ বাড়াবেন। নতুন সামরিক অভিযান তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম আবার বাড়লে নির্বাচনে পাওয়া বার্তাটি আরও জোরালো হবে।

অন্যদিকে, ইরান যদি নির্বাচনী ফলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে ট্রাম্পের ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগের প্রবণতা বাড়তে পারে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে কূটনীতিক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের এমন আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন