'ভ্যান্সের পরাজয় স্বীকার, রুবিও বিদায়ের পথে, হেগসেথকে বরখাস্ত করা হতে পারে' 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়কে নিজেদের পক্ষে কূটনৈতিক সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে ইরান। তেহরানের কর্মকর্তারা ও কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহল মনে করছে, আট মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বরং যুদ্ধের প্রভাব এখন ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে।

এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ানো, আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনার দাবি তুলছেন ইরানের কট্টরপন্থীরা। তাঁদের কেউ কেউ এমন একটি ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র কথাও বলছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি বিদ্রূপ করেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা যুদ্ধে ও নির্বাচনে হেরেছেন। ভ্যান্স পরাজয় স্বীকার করেছেন, রুবিও বিদায়ের পথে, হেগসেথকে বরখাস্ত করা হতে পারে এবং সেন্টকমের কমান্ডার এখন পডকাস্টার! তাহলে ওয়াশিংটনে ঠিক কার কাছে আমাদের এই বার্তা পৌঁছাতে হবে? যুদ্ধ শুরু করলে ভয়াবহ জবাবের মুখোমুখি হতে হবে।’

রেজায়ির এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডারকে নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে—এমন একটি ধারণা তুলে ধরা।

তেহরানের ধারণা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে ট্রাম্পের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি মূল্য দিতে বাধ্য করা উচিত।

রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয় ইরানের কট্টরপন্থীদের নতুন করে কঠোর অবস্থান নেওয়ার যুক্তি জুগিয়েছে। তাঁদের মতে, যুদ্ধে ইরান ইতোমধ্যে কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছে। তাই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকা উচিত।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ‘সামান্যতম আত্মসমর্পণের প্রবণতা’ থেকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, তাঁর এই বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত ইরানি প্রতিনিধিদের উদ্দেশে দেওয়া হয়েছে।

ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম রাজা নিউজের একটি কলামেও যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য করার দাবি জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, দ্রুত কোনো চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পকে সহজে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত হবে না।

কলামটির ভাষ্য, ‘ইরানি জনগণের অর্জন এবং অর্জিত পুঁজি অন্য পক্ষকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ করে দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়।’

এতে আরও বলা হয়, যুদ্ধের আশঙ্কা দূর করার একমাত্র উপায় হলো নিজেদের শক্তি বাড়ানো, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা এবং জ্বালানির দামকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।

ইরানের কট্টরপন্থীদের এসব বক্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্প ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকানদের দুর্বল নির্বাচনী ফলের সঙ্গে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের যোগসূত্র টেনেছেন।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেন, যুদ্ধের প্রভাব তাঁর দলের নির্বাচনী পরাজয়ে আংশিক ভূমিকা রেখেছে। ভ্যান্স আরও সরাসরি এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা যে কারণে হেরেছি, তা হলো যুদ্ধ।’

ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহল এসব বক্তব্যকে নিজেদের দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের যুক্তি, যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে নির্ণায়ক সাফল্য এনে দিতে পারেনি; বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানেও চাপ তৈরি করেছে।

সংঘাতের আট মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো পক্ষই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সামরিক তৎপরতা কিছুটা কমলেও কূটনৈতিক আলোচনায় এখনো বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের আলোচকেরা তেহরান ও দোহার মধ্যে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। কাতার দুই পক্ষের মতপার্থক্য দূর করতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি হতে পারে।

৭ নভেম্বর প্রকাশিত সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের পর ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তবে সংঘাত আবারও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।

অক্টোবরে ট্রাম্প বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না। তবে নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান আবার শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি।

গত সপ্তাহে ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবরও এসেছে। বৃহস্পতিবার রাতেও সেখানে হামলা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় পক্ষই এসব হামলার মাত্রা কম করে দেখানোর চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যাতে চলমান আলোচনা ভেস্তে না যায়।

তবে আরও সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, আরও এগোব কি না। সম্ভব হলে আমি দেশটির বাকি অংশ ধ্বংস করতে চাই না। কিন্তু হয়তো আমাকে তা করতে হতে পারে।’

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। শুক্রবার কাতার জানায়, সংঘাত কমানোর প্রচেষ্টা নিয়ে দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ট্রাম্প।

এর আগের দিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত, জর্ডান, তুরস্ক, সাইপ্রাস ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন।

এদিকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সাতটি শর্ত দিয়েছে তেহরান। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে—সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, ক্ষতিপূরণ প্রদান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

তবে ইরানের এসব দাবি ওয়াশিংটন মেনে নিতে প্রস্তুত কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নির্বাচনী ফলকে আলোচনার শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তেহরান

ইরানের কট্টরপন্থীদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বিপর্যয়কে শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের দুর্বলতা হিসেবে দেখছে না; বরং চলমান যুদ্ধের শর্ত নির্ধারণে নিজেদের দর-কষাকষির শক্তি বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলই ইরানের জন্য সামরিক বা কূটনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। যুদ্ধের প্রকৃত পরিস্থিতি, দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা, নিষেধাজ্ঞা এবং আলোচনার অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে।

সূত্র: এনডিটিভি, সিএনএন, ফক্স নিউজ এবং ইরানি সংবাদমাধ্যম রাজা নিউজ।