দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতায় এবার নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, তারা প্রথমবারের মতো ভয়ংকর খুররমশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এক বিবৃতিতে জানায়, অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর অভিযানের উনিশতম ধাপে এই আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই পর্যায়ে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক খুররমশাহর চার বা খাইবার ক্ষেপণাস্ত্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র তেল আবিব। বিশেষ করে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্কোয়াড্রনের ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই আঘাত হানা হয়। আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়া হাসান ইবনে আলী সাংকেতিক নামে পরিচালিত এই অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে।
তেহরানের দাবি আরও বড়। তাদের মতে, ইসরায়েলের বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এই হামলা প্রতিহত করতে পারেনি। ড্রোনের ঝাঁক এবং ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্মিলিত আক্রমণে তেল আবিবের প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিভিন্ন স্থানে বড় অগ্নিকাণ্ড এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খুররমশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক গবেষণার ফল। দুই হাজার তেইশ সালে প্রথমবারের মতো এই অস্ত্রের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আনা হয়। প্রায় সাড়ে তেরো মিটার দৈর্ঘ্যের এই ক্ষেপণাস্ত্রটির ওজন দেড় থেকে দুই টনের মধ্যে। যদিও এটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে পরিচিত, তবুও এর সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই আরও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কাছাকাছি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর গতি। উৎক্ষেপণের পর এটি শব্দের গতির প্রায় ষোল গুণ দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যেতে পারে। মাত্র পনেরো মিনিটের প্রস্তুতিতেই এটি উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত পাল্লার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো প্রান্ত থেকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে এর।
খুররমশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর মাল্টিপল বিস্ফোরক বহনের ক্ষমতা। একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় আঠারোশ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে। লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছালে এই বিস্ফোরক বহু ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে নিচে নেমে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আক্রমণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে ইরান শুধু ইসরায়েলে হামলার দাবিই করেনি, বরং একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকেও লক্ষ্যবস্তু করার কথা জানিয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে অবস্থিত অন্তত বিশটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, আগের এক ধাপের অভিযানে মার্কিন সেনাদের অনেককে সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে বেসামরিক হোটেলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়েছিল। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অঞ্চলে অবস্থানরত প্রতিটি মার্কিন সেনার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হতে পারে।
তবে এসব দাবির সত্যতা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত ব্যাপ্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।।