যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া বিধ্বংসী যুদ্ধ আজ সপ্তম দিনে পদার্পণ করেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব দাবি করেছে, তাদের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। এই যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটনের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা প্রতিদিন গড়ে ৮৯ কোটি ডলারের বেশি।
গত ২৪ ঘণ্টায় যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইরানে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ও নেতৃত্ব নিয়ে সংঘাত
প্রাণহানি: গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।
আকাশপথের আধিপত্য: ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের ৮০ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে এবং প্রায় ২,৫০০ বার বিমান হামলা চালিয়েছে।
উত্তরসূরি বিতর্ক: আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে সরাসরি ভূমিকা রাখবেন এবং মোজতবা তার কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’।
স্থল যুদ্ধের হুমকি: ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি সতর্ক করেছেন, তারা মার্কিন স্থল অভিযানের অপেক্ষায় আছেন এবং হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে হত্যা ও বন্দি করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
২. উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল
কুয়েত ও বাহরাইন: ইরানের পাল্টা হামলার মুখে কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। বাহরাইনের একটি রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
ইউএই ও কাতার: সংযুক্ত আরব আমিরাত ১২০টির বেশি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। কাতারের রাজধানী দোহাতেও বড় ধরণের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
আমেরিকানদের প্রস্থান: স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার আমেরিকান নাগরিক মধ্যপ্রাচ্য ছেড়েছেন।
৩. ইসরায়েল ও লেবানন পরিস্থিতি
তেল আবিবে হামলা: ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তেল আবিব ও ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বড় ধরণের হামলা চালিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা: নিরাপত্তার স্বার্থে জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং শুক্রবারের জুমার নামাজ বাতিল করা হয়েছে।
স্মোট্রিচের হুমকি: ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বৈরুতের উপশহরগুলোকেও গাজার খান ইউনিসের মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হবে।
৪. যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ট্রাম্পের দাবি: ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের বিমান বাহিনী এখন ‘পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন’।
অর্থনৈতিক ধস: যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। ডাও জোন্স সূচক এক সপ্তাহে ১,০০০ পয়েন্টের বেশি পড়েছে।
কংগ্রেসের সমর্থন: যুদ্ধের বিপক্ষে আনা একটি প্রস্তাব মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ২১৯-২১২ ভোটে নাকচ হয়ে গেছে, যার ফলে ট্রাম্পের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পথ আরও সুগম হলো।
৫. আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
আজারবাইজান: ইরানি ড্রোন হামলায় ৪ নাগরিক আহত হওয়ার পর আজারবাইজান ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে এবং ‘প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা’ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মিশর: প্রেসিডেন্ট সিসি জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে অর্থনৈতিকভাবে ‘জরুরি অবস্থা’ বিরাজ করছে।
ইউরোপ: যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ভূমধ্যসাগরে তাদের নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটিতে একটি ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হার কমিয়ে আনলেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে আক্রমণ আরও জোরদার করার পরিকল্পনা করছে।