বোমার শব্দ আর শোকে ম্লান ইরানের ‘নওরোজ’

বসন্তের আগমনে পারস্যের প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সাজার কথা, তখন ইরানের আকাশজুড়ে উড়ছে যুদ্ধবিমান আর কানে ভাসছে বোমার শব্দ। চলমান ভয়াবহ সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে এবার ফিকে হয়ে গেছে পারস্যের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব ‘নওরোজ’। উৎসবের প্রস্তুতির পরিবর্তে ইরানিদের মনে এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই আর প্রিয়জন হারানোর শোক।

পারস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আগামী ২০ মার্চ বিকেলে শুরু হওয়ার কথা নতুন বছর ১৪০৫। সাধারণত এই সময়ের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ঘরে ঘরে ‘সাবজেহ’ (অঙ্কুরিত ডাল) প্রস্তুত করা এবং বাজারগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উত্তর ইরানের বুকান শহরের এক বাসিন্দা আরব নিউজকে ফোনে জানান, ‘মানুষ এখন নওরোজ নিয়ে ভাবছেই না। সবাই যুদ্ধের আতঙ্কে দিন গুনছে।’ এক শোকার্ত মা বলেন, ‘জীবনের এই প্রথমবার আমি নওরোজের জন্য সাবজেহ তৈরি করতে ভুলে গেছি।’

নওরোজের সূচনালগ্নে পালিত হয় ‘চাহারশানবে সুরি’ বা প্রাচীন আগুন উৎসব। এই দিনে মানুষ আগুনের ওপর দিয়ে লাফিয়ে অশুভ শক্তিকে দূর করার প্রতীকী রীতি পালন করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জনসমাগম নিষিদ্ধ থাকায় এই উৎসব পালন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় উৎসবের আনন্দ এখন সুদূর পরাহত।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটিতে এখন ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে। অনেক দোকানপাট ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে তারা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তেহরানের যে বাজারগুলো নওরোজের আগে উৎসবমুখর থাকত, সেখানে এখন কেবল নিস্তব্ধতা।

এত সব প্রতিকূলতার মাঝেও অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বুকান শহরের এক বাবা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার ছয় বছরের ছেলে যুদ্ধ বোঝে না। সে শুধু নওরোজের নতুন জামা, মিষ্টি আর কেক চায়।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, বড়দের উদ্বেগ দেখে শিশুরাও বুঝতে পারছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।

খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামেরও আগের সময়ের এই প্রাচীন পারস্য উৎসব এবার ইতিহাসের অন্যতম এক অন্ধকার সময় পার করছে।