চলতি সপ্তাহে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধের অবসানে যে দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়েছে, তাতে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে- হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ যে সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালী এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তেহরান এখন এই পথটিকে তাদের বার্ষিক আয়ের একটি বিশাল উৎস এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
ইরান দীর্ঘকাল ধরে হামলার শিকার হলে এই প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়ে আসলেও, তারা যে সত্যিই এটি কার্যকরভাবে বন্ধ করে বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির করে দেবে, তা অনেকেরই ধারণার বাইরে ছিল। এই কৌশলের অভাবনীয় সাফল্য তেহরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, "ইরান নিজেই অবাক হয়ে গেছে যে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা কতটা সস্তা এবং সহজ। যুদ্ধের অন্যতম শিক্ষা হলো তারা এই নতুন প্রভাব বা লেভারেজটি খুঁজে পেয়েছে এবং ভবিষ্যতেই এটি ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রবল। এখন এর থেকে অর্থ উপার্জন বা মনিটাইজেশন সেই পরিকল্পনারই অংশ।"
ওয়াশিংটন এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের পর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের টোল বা মাশুল ব্যবস্থা চালুর প্রচেষ্টা। ফ্রান্সের জি-৭ বৈঠক শেষে রুবিও বলেন, "এটি কেবল অবৈধই নয়, বরং অগ্রহণযোগ্য ও বিপজ্জনক। বিশ্বকে এটি মোকাবিলায় পরিকল্পনা করতে হবে।" জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সেখানে 'মুক্ত ও মাশুলহীন নৌ-চলাচলের' প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জলপথ অবরোধের এই প্রভাব বা লেভারেজ অব্যহত রাখা উচিত। এর আগে পারমাণবিক চুক্তি বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আলোচনা চললেও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কখনোই আলোচনার টেবিলে ছিল না। কিন্তু এখন ইরানি সংসদ সদস্যরা এমন একটি বিল বিবেচনা করছেন যার মাধ্যমে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ থেকে টোল আদায় করা হবে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ জেমস ক্রাস্কা জানান, আন্তর্জাতিক কোনো প্রণালীতে উপকূলীয় রাষ্ট্রের মাশুল আদায়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত হলেও এটি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের পথ হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে অবাধ চলাচলের অধিকার (Transit Passage) বজায় থাকার কথা।
বিশেষজ্ঞরা এই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সিএনএন-এর হিসেব বলছে, এটি সফল হলে ইরানের আয় মিসরের সুয়েজ খালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। যদি প্রতিটি বড় ট্যাঙ্কার থেকে ২ মিলিয়ন ডলার করে মাশুল আদায় করা হয়, তবে ইরান মাসে শুধুমাত্র তেল থেকেই ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। এলএনজি যোগ করলে এই অঙ্ক ৮০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০২৪ সালে ইরানের মাসিক তেল রপ্তানি আয়ের ১৫-২০ শতাংশের সমান।
নিষেধাজ্ঞার কারণে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির ঘাটতি মেটাতেই ইরান এই পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ইরান দাবি করছে প্রণালীটি উন্মুক্ত, তবে তারা শর্ত জুড়ে দিয়েছে যে 'অবন্ধুসুলভ' নয় এমন জাহাজগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে চলাচল করতে পারবে।
শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা বা জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, কিছু ট্যাঙ্কার ইতিমধ্যে ইরানের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে চলাচল করছে এবং গুঞ্জন রয়েছে যে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নির্দিষ্ট কিছু অপারেটর অর্থ প্রদান করেছে। 'লয়েডস লিস্ট' (Lloyd’s List)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ২০টিরও বেশি জাহাজ একটি নতুন করিডোর ব্যবহার করেছে এবং অন্তত দুটি জাহাজ ২ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে পার হয়েছে বলে জানা গেছে। আইআরজিসি অনুমোদিত জাহাজগুলোর জন্য একটি নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে, কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচনার অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব নৌ-বাণিজ্য কার্যত অচল হয়ে আছে। সূত্র: সিএনএন