হামাসের নতুন প্রধান হিসেবে খলিল আল-হাইয়ার নির্বাচিত হওয়ার খবর গাজাজুড়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিলেও অধিকাংশ সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতির চেয়ে বেঁচে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। টানা যুদ্ধ, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি, নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট এবং বিশুদ্ধ পানির অভাব, এসবের মধ্যেই তাদের দৈনন্দিন জীবন আটকে আছে।
হামাসের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে এ সপ্তাহে সাবেক রাজনৈতিক প্রধান খালেদ মেশালকে পরাজিত করে সংগঠনটির নেতৃত্বে আসেন খলিল আল-হাইয়া। তবে গাজার বহু বাসিন্দার মতে, নেতৃত্বে কে এলেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুদ্ধের অবসান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ।
৬৩ বছর বয়সী নোমান সালেহ বলেন, ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানে তার কারখানা ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই ক্ষতি তার পুরো জীবনকে বদলে দিয়েছে। তার ভাষায়, মানুষ আজ ক্ষুধার্ত, অপমানিত এবং চরম দুর্ভোগে রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সব পক্ষই এই পরিস্থিতির জন্য কোনো না কোনোভাবে দায়ী। তার মতে, জাতীয় স্বার্থকে কোনো সংগঠনের নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়। আল-হাইয়া বা অন্য কেউ নেতৃত্বে এলেও সাধারণ মানুষের বাস্তবতায় তেমন পরিবর্তন হবে না। দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ নেতৃত্বই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি অবরোধের কারণে খাদ্য, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজা সিটির ৪০ বছর বয়সী এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী আহমেদ, যিনি নিরাপত্তার কারণে পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, হামাসের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আল-হাইয়া নেতৃত্বে এসেছেন। যুদ্ধের মধ্যে সংগঠনটির বহু শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্ব হামাসের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার প্রচেষ্টারই প্রতিফলন।
তার মতে, ইসরায়েল নেতৃত্বশূন্য পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করলেও হামাস দেখিয়েছে, তারা সংগঠন হিসেবে টিকে থাকতে সক্ষম। তবে একই সঙ্গে গাজার মানুষ এমন নেতৃত্ব চায়, যারা তাদের কষ্ট বুঝবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে।
২৮ বছর বয়সী আলি আবু আমশি যুদ্ধের মধ্যে মা-বাবা ও এক ভাইসহ পরিবারের ২২ সদস্যকে হারিয়েছেন। গাজা সিটিতে নিজের বাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুতও হয়েছেন তিনি। তার কথায়, দীর্ঘ যুদ্ধ মানুষের রাজনৈতিক আগ্রহ অনেকটাই মুছে দিয়েছে।
তিনি বলেন, কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটি এখন আর তাদের কাছে মুখ্য নয়। তারা শুধু চান সীমান্ত খুলে যাক, খাবার ও পানি মিলুক এবং স্বাভাবিকভাবে বাঁচার সুযোগ ফিরে আসুক। বারবার যুদ্ধ ও ধ্বংসের চক্রে ফিরে যেতে তারা আর চান না।
আবু আমশির ভাষায়, এই যুদ্ধ তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। প্রিয়জনদের হারানোর পরও তিনি বেঁচে আছেন, কিন্তু সেই জীবন স্বাভাবিক নয়। যদি মানুষকে খাবার, পানি ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মাহমুদ হানিয়েহ মনে করেন, আল-হাইয়ার নির্বাচন হামাসের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। তার মতে, ৭ অক্টোবরের ঘটনার পরিকল্পনায় জড়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে ইসরায়েল আল-হাইয়াকে বিবেচনা করে। তাকে নেতৃত্বে আনার মাধ্যমে হামাস বোঝাতে চেয়েছে, তারা সেই রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
হানিয়েহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হামাস কিছু রাজনৈতিক নমনীয়তা দেখালেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। তার মতে, ভবিষ্যতে আইনসভা নির্বাচন হলে ফিলিস্তিনিদের সামনে নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার আরও বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসনের পর হামাস এর আগে ঘোষণা দিয়েছে, তারা সরকার ভেঙে দিয়ে ক্ষমতা একটি ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে জাতিসংঘ-সমর্থিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর কাছে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের আওতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গঠিত এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত কমিশনার আলি আবদেল হামিদ শাআথ। তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল কমিটির সদস্যদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। ফলে তারা অস্থায়ীভাবে কায়রো থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তাফা ইব্রাহিমের মতে, হামাসের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি গভীর আস্থাহীনতারই প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বিমান হামলা এবং বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতায় অনেক মানুষ হামাসসহ সব রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আস্থা হারিয়েছেন।
তার ভাষায়, গাজার অনেক বাসিন্দা এখন হামাসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয়ে আছেন। কেউ কেউ এমন ব্যবস্থার পক্ষেও মত দিচ্ছেন, যাতে গাজার বেসামরিক বা প্রশাসনিক শাসনে হামাসের ভূমিকা না থাকে।
ইব্রাহিম বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি মানুষের জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে নেতৃত্ব বদলের খবর তাদের কাছে গুরুত্ব হারাবে। সাধারণ মানুষ এখন শুধু যুদ্ধের অবসান, একটি কার্যকর সমঝোতা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ দেখতে চান। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নতুন নেতৃত্ব গাজার মানুষের বাস্তবতা বদলাতে কী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।