গাজা খালি করার পরিকল্পনা ইসরায়েলি মন্ত্রীর

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম

গাজা উপত্যকা থেকে প্রথম বছরেই আড়াই লাখ ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, পরবর্তী ছয় বছরে গাজার বাকি বাসিন্দাদেরও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে।

ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এই পরিকল্পনা প্রকাশ করেন বেন-গভির। তিনি এটিকে ‘বাস্তবসম্মত’ পরিকল্পনা হিসেবে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, কিছু দেশ গাজার ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে কোন কোন দেশ এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

বেন-গভিরের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রথম বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনির গাজা ছাড়ার কথা বলা হয়েছে। এরপর আরও প্রায় ছয় বছরে উপত্যকার অবশিষ্ট প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কয়েক বছরের মধ্যে গাজার প্রায় পুরো ফিলিস্তিনি জনসংখ্যাই উপত্যকার বাইরে চলে যাবে।

বেন-গভির এই প্রক্রিয়াকে ‘স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন’ হিসেবে তুলে ধরলেও মানবাধিকারকর্মী ও সমালোচকেরা বিষয়টিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি হিসেবে দেখছেন। গাজার বর্তমান মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে বাসিন্দাদের ‘স্বেচ্ছায়’ চলে যাওয়ার সুযোগ বাস্তবে কতটা স্বেচ্ছামূলক হতে পারে, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন উঠেছে।

এর একদিন আগেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, গাজার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ‘এই অভিবাসন’ ছাড়া সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের সমুদ্র, আকাশ বা অন্য কোনো পথে গাজার বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চাওয়া হচ্ছে।

বেন-গভিরের নতুন পরিকল্পনা সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। পরিকল্পনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২০ পৃষ্ঠার একটি নথিতে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য নতুন একটি সরকারি মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘স্বেচ্ছামূলক’ নাকি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি?

ইসরায়েলি ডানপন্থি রাজনীতিকেরা দীর্ঘদিন ধরেই গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র চলে যাওয়ার ধারণা সামনে আনছেন। তাঁদের বক্তব্য, যারা গাজা ছাড়তে চান, তাদের চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন—ধ্বংসস্তূপ, নিরাপত্তাহীনতা, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে মানুষ যদি বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়ে, সেটিকে কীভাবে প্রকৃত অর্থে ‘স্বেচ্ছামূলক’ বলা যায়?

আন্তর্জাতিক আইনেও বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক কোনো এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে বেসামরিক জনগণকে জোরপূর্বক স্থানান্তর যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়তে পারে। ফলে বেন-গভিরের প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

নির্বাচনের আগে বিতর্কিত প্রস্তাব

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বেন-গভিরের এই পরিকল্পনা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি ‘জিউইশ পাওয়ার’ দল দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে জোর দিয়ে আসছেন। ফলে বেন-গভিরের প্রস্তাব ইসরায়েলি সরকারের সামগ্রিক নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি বাস্তবে সরকারি নীতিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এর আগে ২০২৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও গাজার ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে পুনর্বাসনের একটি ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। সেই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং পরবর্তীতে তা নিয়ে নানা ধরনের পরিবর্তিত অবস্থান দেখা যায়। এবার ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বক্তব্যে একই ধরনের ধারণা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ

গাজা থেকে আড়াই লাখ মানুষকে প্রথম বছরেই সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা, তাদের কোথায় নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আদৌ তাদের গ্রহণ করবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

তবে পরিকল্পনাটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটে বিপর্যস্ত উপত্যকাটির বাসিন্দাদের জন্য এটি আরও বড় অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বেন-গভিরের প্রস্তাব এখনো একটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা। এটি ইসরায়েল সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়নাধীন কর্মসূচি—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা পর্যায়ের একাধিক ইসরায়েলি কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার ধারণাটি আবারও প্রকাশ্যে এসেছে।

আরও পড়ুন