হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধসিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে টানা ১১ রাতের মতো দেশটিতে ভারী বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
বুধবার (২২ জুলাই) গভীর রাতে রাজধানী তেহরানসহ একাধিক কৌশলগত অঞ্চলে এই হামলা চালানো হয়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বরাতে জানা গেছে, হামলা চলাকালে পুরো তেহরানজুড়ে একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে এবং ইরানের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের এ সংঘাতের ১১তম রাতের হামলায় মূলত ইরানের সামরিক অপারেশনাল সেন্টার, নৌঘাঁটি, বিমান হ্যাঙ্গার, ড্রোন গুদাম এবং সামরিক রসদ অবকাঠামো লক্ষ্য করে নিখুঁত আঘাত হানা হয়েছে।
এবারের হামলায় মার্কিন বাহিনী তাদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। আগের দিনগুলোতে হামলা মূলত দক্ষিণাঞ্চল ও হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক থাকলেও এবার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমের শহরগুলোতে হামলা বাড়ানো হয়েছে।
উত্তর-পশ্চিমের অন্যতম বড় শহর তাবরিজের উপকণ্ঠে একটি সামরিক ঘাঁটিতে রাত ২টা ৪০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তবে শহরের ভেতরে কোনো হামলা হয়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিভাগ।
ফার্স ও তাসনিম নিউজের তথ্য মতে, দক্ষিণের বুশেহর, সিরিক এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের বেহবাহান ও ওমিদিয়েহ শহরের সংলগ্ন সামরিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন মিসাইল আছড়ে পড়েছে।
এদিকে কুয়েতি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাদের আকাশে একটি ইরানি ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। চলতি মাসে মার্কিন অভিযান শুরুর পর থেকে কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরান ক্রমাগত পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এই যুদ্ধ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম রাজনৈতিক বিতর্ক। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে জানান, ইরানে অভিযানের খরচ ইতোমধ্যেই ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং পেন্টাগনের অতিরিক্ত ৯০ বিলিয়ন ডলার জরুরি বাজেট প্রয়োজন। মার্কিন সিনেটর জন অসফসহ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই বিপুল অর্থ দাবির তীব্র বিরোধিতা করে সরকারের আগের ‘ইরানি সামরিক বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে’ দাবির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সংঘাত আরও উসকে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ নামের একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় খুব শীঘ্রই অতি ভারী হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছেন।
ট্রাম্পের এই চরম হুঁশিয়ারির জবাবে ইরানের ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত এলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থ ও ঘাঁটিতে হামলার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
সেন্টকম দাবি করেছে, বিগত তিন মাসে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অন্তত ৩০টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারক (MoU) ভেঙে যাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটি খোলা রেখেছে এবং মে মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৯০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ ও ৪৫০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সাথে বৈঠক করেছেন ইরানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি। অন্যদিকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল থানি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে উভয় পক্ষকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পূর্ববর্তী সমঝোতা চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সহিংসতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: আল জাজিরা