যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে আলোচনা চলছে বলে যে দাবি করেছেন, তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনীটি। আইআরজিসির মুখপাত্র জেনারেল মোহেব্বি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না।
সোমবার (১৭ আগস্ট) ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের যুদ্ধ নিয়ে আইআরজিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের দাবি সামনে আসার পর এর প্রতিক্রিয়া জানান জেনারেল মোহেব্বি। তিনি বলেন, আইআরজিসি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমানে কোনো সংলাপ বা আলোচনা হচ্ছে না।
আইআরজিসির মুখপাত্র ট্রাম্পের দাবিকে ‘মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় ও অসহায়ত্ব থেকে জন্ম নেওয়া কল্পনা। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।জেনারেল মোহেব্বি বলেন, আইআরজিসি ইরানি জনগণ ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তি এবং সামরিক সক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে। যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি দেশের অবস্থান তুলে ধরাই তাদের দায়িত্ব। কূটনৈতিক আলোচনা পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের অন্য অংশের ওপর ন্যস্ত।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আলোচনা চলছে না বলে দাবি করেন আইআরজিসির এই মুখপাত্র। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং তাদের অতীতের আচরণও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করেছে। এসব কারণে বর্তমানে মার্কিন পক্ষের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
জেনারেল মোহেব্বি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও একই অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বারবার চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের কারণে তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ দেখছে না।
ট্রাম্পের গোপন যোগাযোগের দাবি কেন সামনে এসেছে, সে বিষয়েও মন্তব্য করেন আইআরজিসির মুখপাত্র। তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য মূলত মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের অংশ। তবে এসব প্রচারণা যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারবে না।মোহেব্বির ভাষ্য, ট্রাম্পের বক্তব্য যুদ্ধের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করবে না। তাঁর দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘কল্পনা’ যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো সুবিধা এনে দেবে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের একটি উদ্দেশ্য হতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেলের বাজারে সাময়িকভাবে প্রভাব তৈরি করা। তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে প্রকৃতপক্ষে একটি পথই খোলা রয়েছে-পরাজয় মেনে নিয়ে ইরানের নির্ধারিত শর্ত গ্রহণ করা।জেনারেল মোহেব্বি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যত দ্রুত নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে, তত দ্রুত দেশটি আরও বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর প্রশাসন ইরানের আইআরজিসির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি গোপন চ্যানেল তৈরি করেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং পরমাণু অস্ত্র অর্জন ঠেকানোকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের ওই দাবির পর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বরজানির ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আসে। কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টায় বরজানি ভূমিকা রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-দুই দেশের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক থাকায় তাঁকে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল বলে কুর্দিস্তান সরকারের এক কর্মকর্তা জানান।
তবে আইআরজিসির সর্বশেষ বক্তব্যে সেই যোগাযোগকে সরাসরি আলোচনা হিসেবে স্বীকার করা হয়নি। বরং সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো ধরনের সংলাপ চলছে না।
এ অবস্থায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন গোপন যোগাযোগের দাবি করলেও আইআরজিসি তা অস্বীকার করছে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যের এই বড় ধরনের পার্থক্যই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনার চিত্র স্পষ্ট করছে।