মার্কিন ডলারের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। তাঁর মতে, ইরান ও ইরাকের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন, পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) বাগদাদে ইরানি দূতাবাসে ইরান ও ইরাকের ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদের এক সমাবেশে এসব কথা বলেন গালিবাফ। তিনি বলেন, দুই দেশের বেসরকারি খাত নানা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব সমস্যা অগ্রাধিকারভিত্তিতে চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে ইরানের চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে তেহরানে একটি ফলোআপ বৈঠক করার কথা জানান গালিবাফ। তাঁর ভাষ্য, দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করলে হবে না; এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা।
ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার আরও বলেন, ইরানের সীমান্তবর্তী শহরগুলোর দক্ষ ও প্রতিভাবান জনশক্তি থেকে ইরাকও উপকৃত হতে পারে। দুই দেশের সীমান্তকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে এ জনশক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গালিবাফের বক্তব্যে অর্থনীতির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও যুদ্ধের প্রসঙ্গও উঠে আসে। ইরান যুদ্ধ চায়, এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ইরান কখনো যুদ্ধকামী ছিল না। তবে মুসলিম উম্মাহর নীতির আলোকে দেশের মর্যাদা ও সম্মানকে কেউ পদদলিত করতে চাইলে তা মেনে নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ইরান নিজেদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। তাঁর মতে, যারা যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, শান্তির মূল্য তাদের চেয়ে বেশি কেউ বোঝে না।
তবে গালিবাফের বক্তব্যে শান্তির সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতিকেও পাশাপাশি রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি না থাকলে কূটনীতির কার্যকারিতাও সীমিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ কূটনীতি তখনই মূল্য পায় এবং এগিয়ে যেতে পারে, যখন তার পেছনে প্রয়োজনীয় সামরিক প্রস্তুতি থাকে।
ইরান ও ইরাকের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে গালিবাফ বলেন, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দুই দেশ কখনো যুদ্ধ, কখনো শান্তি, আবার কখনো যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যবর্তী এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। এ পরিস্থিতির পেছনে তিনি এই অঞ্চলের মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূরাজনৈতিক সক্ষমতার প্রতি বিদেশি শক্তিগুলোর লোভকে দায়ী করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর, বাব আল-মান্দাব ও সুয়েজ খালের ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। গালিবাফের দাবি, বিশ্বের সামুদ্রিক পরিবহনের প্রায় ৭৫ শতাংশ মুসলিম দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন জলপথের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অভিযোগ, এসব সম্পদ ও কাঁচামাল দখল বা লুট করার লক্ষ্যেই শত্রুরা এই অঞ্চলে সক্রিয়।
এ কারণেই ইরান ও ইরাকের বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের ওপর জোর দেন গালিবাফ। তিনি বলেন, মার্কিন আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে গেছে এবং দুই দেশের উচিত নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের উদ্দেশে গালিবাফ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বুঝতে পেরেছে যে সামরিকভাবে ইরান ও ইরাককে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাই তারা এখন তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তিক বা মানসিক এবং অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে ঝুঁকেছে। তাঁর ভাষায়, এই লড়াইয়ের মাঠে এখন ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধিরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তবে একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতার ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেন গালিবাফ। তিনি বলেন, দেশের সামরিক শক্তি যতই বড় হোক, জনগণ যদি ক্ষুধার্ত থাকে, অর্থের প্রবাহ না থাকে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেমে যায় এবং জাতীয় উৎপাদন দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে কোনো দেশই টিকে থাকতে পারবে না।
এই প্রসঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে একই দেহের দুটি ডানা হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। তাঁর মতে, বিনিয়োগের জন্য নিরাপত্তা প্রয়োজন। আবার অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তাও স্থায়ী করা সম্ভব নয়।
গালিবাফ ইরান ও ইরাক থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক পথের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, এই পথ প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর মধ্য দিয়ে গেছে এবং এটি ইরান-ইরাকের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিসর, শক্তি ও স্বাধীনতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বৈঠকে দুই দেশের বেসরকারি খাতের আটজন প্রতিনিধি ব্যাংকিং, আইনি ও শুল্কসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা ইরানের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে যৌথ শিল্পাঞ্চল গঠন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে ইরাকি দিনার ও ইরানি তুমান ব্যবহারের ব্যবস্থা, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনে বেসরকারি খাতের যৌথ অংশগ্রহণ এবং সীমান্তপারের ব্যবসায় সরকারি সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।
ফলে গালিবাফের বাগদাদ সফরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেল। বিশেষ করে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রস্তাব ইরান-ইরাক সম্পর্ককে শুধু দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সামনে এনেছে। সূত্র: সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি