ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের খরচ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান বা সেনা মোতায়েনের ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর আর্থিক, মানবিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মূল্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাবেও ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, আর স্বাধীন অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে প্রকৃত খরচ অনেক বেশি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধের সরাসরি ব্যয় প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারে। একটি করে কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
তবে এই হিসাবকে যুদ্ধের পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। হার্ভার্ডের যুদ্ধ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ লিন্ডা বিলমেসের মতে, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় হিসাব করলে এর পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে তা এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম পুনঃস্থাপন, আহত সেনাদের চিকিৎসা, প্রবীণ সেনাদের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা এবং যুদ্ধের জন্য নেওয়া ঋণের সুদের মতো ব্যয়ও যুক্ত হবে।
যুদ্ধের শুরুতেই ব্যয়ের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়েছিল। সংঘাতের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল বলে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের জানানো হয়। ওই হিসাবেও সব ধরনের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে এপি জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে থাকেনি। দেশটির পেট্রোলের দাম আগস্টে প্রথমবারের মতো গড়ে প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় পরিবহন, বিমান ভ্রমণ ও বিভিন্ন পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত বা Strategic Petroleum Reserve (SPR) ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আগস্টের শেষ দিকে মজুত নেমে আসে প্রায় ২৮৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেলে, যা ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়। ফলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট দেখা দিলে ওয়াশিংটনের হাতে বাজার স্থিতিশীল করার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমে গেছে।
সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ
যুদ্ধের খরচ শেষ পর্যন্ত শুধু সরকারি বাজেটেই আটকে থাকে না। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, পণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচও বাড়ে। এ কারণে যুদ্ধের আর্থিক বোঝার একটি বড় অংশ সাধারণ ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে একজন মার্কিন পরিবারের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক চাপ ইতোমধ্যে ১,২০০ ডলারের বেশি হতে পারে।
ইরানের পরিস্থিতি আরও কঠিন। দেশটির অর্থনীতি আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির চাপে ছিল। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আগস্টের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সামরিক সক্ষমতারও মূল্য আছে
যুদ্ধের আরেকটি অদৃশ্য খরচ হলো অস্ত্রভাণ্ডারের ক্ষয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। এগুলো পুনরায় তৈরি করতে শুধু অর্থই নয়, কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন। এতে অন্য কোনো সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক প্রস্তুতিও প্রভাবিত হতে পারে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখার অর্থ হলো অন্যান্য অঞ্চল থেকে সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া। ফলে যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক পরিকল্পনাতেও পড়ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অসম প্রভাব
যুদ্ধের প্রভাব অবশ্য সব দেশের ওপর সমান নয়। শেয়ারবাজার প্রাথমিক ধাক্কার পর অনেকটাই ঘুরে দাঁড়ালেও ভোক্তা ও ভ্রমণকারীদের ওপর জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সার ও অন্যান্য কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য শুধু ওয়াশিংটন বা তেহরানের সামরিক বাজেটের হিসাব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য, অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠন, মানবিক ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা।
ছয় মাস পরও সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখনো বড় উদ্বেগ হয়ে আছে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এর প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ তত কঠিন হবে, এবং সম্ভাব্য ব্যয়ও তত বাড়বে।