গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা তেহরান-ওয়াশিংটনের চিরাচরিত রাজনৈতিক টানাপোড়েনের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
পরিচিত মার্কিন সাংবাদিক ও উপস্থাপক টাকার কার্লসন ট্রাম্পের পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ সংক্রান্ত বক্তব্যকে একটি লাল রেখা অতিক্রমের শামিল বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, যে রাজনৈতিক নেতা পারমাণবিক অস্ত্রের প্রথম প্রয়োগের প্রসঙ্গ তোলেন, তিনি নেতৃত্ব চালিয়ে যাওয়ার যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলেন এবং ট্রাম্পকে অবিলম্বে ক্ষমতা থেকে সরানো উচিত।
তবে এই আলোচনার গুরুত্ব শুধু কার্লসনের ব্যক্তিগত অবস্থানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত বিষয় হলো, গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী শক্তিগুলোর কাছেও ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক লাল রেখা হিসেবে বিবেচিত একটি প্রশ্ন ফের সামনে এসেছে - কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি আঞ্চলিক সংকটে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলতে পারেন, তাও আবার এমনভাবে যাতে বৃহত্তর কৌশলগত পরিণতি এড়ানো যায়?
ইরানের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির সময় এর আগেও ট্রাম্প এমন ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, যা হুমকির মাত্রাকে যথেষ্ট উচ্চে নিয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় না এলে গোটা একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। যদিও পরবর্তীতে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, এমন অস্ত্রের প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হুমকি, ধমক আর বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্যকার দূরত্ব কখনোই এতটা স্পষ্ট থাকে না যে তা সহজে চিহ্নিত করা যায়। কোনো হুমকি তখনই বিপজ্জনক রূপ নেয়, যখন প্রতিপক্ষ তার বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে নিজেদের হিসাব-নিকাশে যুক্ত করতে বাধ্য হয়।
ইরানের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি দ্বিগুণ গুরুত্ব বহন করে। গত কয়েক বছরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রমাণ করেছে, সামরিক চাপ বা হুমকির মুখে পড়লেই তারা প্রতিপক্ষের দাবি মেনে নেওয়ার পথে হাঁটে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ হুমকিও যখন ওয়াশিংটনের জন্য বাস্তব ও উল্লেখযোগ্য মূল্য পরিশোধের প্রশ্ন তুলেছে, তখন মার্কিন প্রশাসনকেই পিছু হটতে বা অবস্থান বদলাতে দেখা গেছে।
এই বাস্তবতা থেকেই ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপ নীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো হুমকি তখনই কার্যকর হয়, যখন তার পেছনে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে। বারবার হুমকি দেওয়া হলেও তা যদি কার্যক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল না আনে, তাহলে শুধু প্রতিরোধ ক্ষমতাই কমে না, বরং হুমকিদাতার নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইরানের আচরণ বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু সামরিক শক্তি বা ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনের সংখ্যা দেখলেই চলবে না। মূল প্রশ্ন হলো, এক ধরনের পারস্পরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা অনেক বেশি হলেও শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা আর একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিণতি অর্জন করা-এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ইরানও ঠিক এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্তের মূল্য বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করছে। তেহরান জানে, সামরিক সক্ষমতার পরিমাণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হতে পারবে না, তবে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের খরচ-লাভের হিসাব বদলে দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব। প্রতিরোধ ধারণার প্রকৃত অর্থ এখানেই নিহিত -কোনো দেশকে প্রতিপক্ষকে হারাতে হবে না, শুধু এটুকু বোঝাতে পারলেই যথেষ্ট যে সামরিক বিজয় মানেই রাজনৈতিক বিজয় নয়।
তাই ট্রাম্প যখন কোনো দেশ বা সভ্যতা ধ্বংসের কথা বলেন, তখন বিষয়টি কেবল তার বক্তব্যের তীব্রতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। আসল প্রশ্ন হলো, এমন সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক মূল্য পরিশোধে ওয়াশিংটন সত্যিই প্রস্তুত কি না।
কার্লসনের প্রতিক্রিয়াকেও এই একই প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ নীতি ও বিদেশি যুদ্ধ সম্প্রসারণ নিয়ে বারবার সতর্কতা জানিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাই তার আপত্তি নিছক ট্রাম্পের সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ নয়, এর পেছনে গভীরতর একটি উদ্বেগ কাজ করছে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার যদি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির স্বাভাবিক বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টি আর কেবল ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অন্য দেশগুলোও বার্তা পাবে যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, প্রতিরোধ নীতি এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের সীমারেখাও একজন প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তে বদলে যেতে পারে।
এর ফলে একধরনের ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। মহাশক্তিগুলোর মুখোমুখি নিজেদের দুর্বল মনে করা দেশগুলো আগের চেয়ে বেশি করে স্বাধীন প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক হুমকি কমার পরিবর্তে বরং অধিকতর প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেতে পারে।
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্রকে একটি ব্যতিক্রমী বিকল্প ও প্রতিরোধের চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রাত্যহিক রাজনৈতিক বিরোধে এই ধরনের বক্তব্য যত বেশি পুনরাবৃত্তি হবে, প্রতিরোধমূলক হুমকি আর বাস্তব প্রয়োগের হুমকির মধ্যকার সীমারেখাও তত বেশি অস্পষ্ট হয়ে পড়বে।
এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। ওয়াশিংটনের শক্তি শুধু বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধবিমান বা পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও মিত্রদের আস্থার ওপর। মিত্ররা যদি মনে করে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত তাদের এমন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে দিতে পারে যার নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাবে, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই আরও স্বাধীন বিকল্পের সন্ধান করবে। ফলে পারমাণবিক হুমকি ওপর থেকে শক্তির প্রদর্শনী মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ক্ষমতা পরিচালনায় সংকটের লক্ষণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে সবকিছু কেবল ট্রাম্পের ব্যক্তিসত্তায় সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। তিনি হয়তো অন্য অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি স্পষ্টভাষী, আক্রমণাত্মক ও অননুমেয়, কিন্তু বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি যে সমস্যার মুখোমুখি, তা তার আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। মূল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও তা টেকসই রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তরের সক্ষমতার মধ্যকার ফারাক। ওয়াশিংটন এখনো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, তবে প্রশ্ন হলো হামলার পর কী হয়? প্রতিপক্ষ কি আত্মসমর্পণ করে? মিত্ররা কি পাশে থাকে? দেশটির জনমত কি যুদ্ধের মূল্য মেনে নেয়? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের চাওয়া মতো জায়গায় যুদ্ধ থামাতে পারবে?
কার্লসনের মন্তব্যের মূল বার্তা সম্ভবত এটাই - সামরিক শক্তি প্রয়োগের সীমারেখা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই গুরুতর মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুখোমুখি অবস্থান নিতে পারে, তবে এটি ভুলে গেলে চলবে না, এই বিরোধে যতবারই পারমাণবিক হুমকির ভাষা প্রবেশ করবে, ততবারই ঝুঁকির পরিধি দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হবে। প্রশ্নটি আর কেবল ট্রাম্প কী বলছেন বা ইরান কীভাবে সাড়া দিচ্ছে তাতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রশ্নটি হলো, পারমাণবিক হুমকি যদি পররাষ্ট্রনীতির ভাষায় স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে কে নিশ্চয়তা দেবে যে একদিন তা হুমকির সীমা পেরিয়ে বাস্তবে রূপ নেবে না?