মদিনার পবিত্র ভূমিতে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেখানে ইতিহাস শুধু পাথর আর স্থাপত্যে আটকে নেই; বরং প্রতিটি ইট, প্রতিটি প্রান্তর আর প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবিজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্মৃতি। মসজিদে গামামা তেমনই এক স্থান, যার পরিচয়ের সঙ্গেই মিশে আছে নামাজ, ঈদ, বৃষ্টির প্রার্থনা আর মেঘের এক অপূর্ব স্মৃতি।
মসজিদে নববীর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে, মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে মসজিদে গামামা। আয়তনে এটি হয়তো মসজিদে নববীর মতো বিশাল নয়, কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এর তাৎপর্য গভীর। কারণ বর্তমান স্থাপনাটি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেই স্থানটি একসময় পরিচিত ছিল ‘মুসাল্লা’ নামে, যার অর্থ খোলা প্রান্তর, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে নামাজ আদায় করতেন।
এই স্থানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঈদের নামাজের স্মৃতিও। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করতেন। তখন সেখানে কোনো মসজিদ ছিল না; ছিল একটি খোলা প্রান্তর। সময়ের পরিক্রমায় সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানেই গড়ে ওঠে মসজিদ।
তবে মসজিদে গামামার সবচেয়ে আবেগঘন পরিচয় এসেছে বৃষ্টির সঙ্গে।
একসময় মদিনায় অনাবৃষ্টি দেখা দিলে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে এই প্রান্তরে নামাজ আদায় করেন। ইসলামী ঐতিহ্যে বর্ণিত আছে, সেই প্রার্থনার সঙ্গে মেঘের আগমন ও বৃষ্টির স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আর সেখান থেকেই স্থানটির নামের সঙ্গে মিশে যায় ‘গামামা’, আরবি ভাষায় যার অর্থ মেঘ।
শুধু বৃষ্টির স্মৃতিই নয়, ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই স্থানটির সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যুক্ত। আবিসিনিয়ার ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজাশির ইন্তেকালের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য গায়েবানা জানাজা আদায় করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে মসজিদে গামামার অবস্থান কেবল একটি স্থাপত্যিক নিদর্শন নয়; এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগের বহু স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক স্থান।
মসজিদটির বর্তমান স্থাপত্যেও মদিনার ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। গাঢ় পাথরের দেয়াল, স্বতন্ত্র গম্বুজ ও মিনার একে আশপাশের স্থাপনাগুলো থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মসজিদটির সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ হয়েছে। সৌদি যুগেও এর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
রমজানে মদিনার চিত্র বদলে যায়। মসজিদে নববীকে ঘিরে লাখো মানুষের ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার আবহ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশের কাছেই নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে মসজিদে গামামা। দর্শনার্থীরা এখানে এসে শুধু একটি পুরোনো মসজিদ দেখেন না; তাঁরা ফিরে তাকান ইসলামের সেই সময়ের দিকে, যখন মদিনার খোলা প্রান্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে নামাজ আদায় করতেন।
এই কারণেই মসজিদে গামামার গুরুত্ব তার স্থাপত্যের চেয়ে অনেক বড়। এর দেয়াল হয়তো আজকের, কিন্তু এর স্মৃতি বহু শতাব্দী পুরোনো। এখানে ঈদের তাকবিরের স্মৃতি আছে, আছে বৃষ্টির জন্য করা প্রার্থনার স্মৃতি; আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে মদিনার মানুষের সম্পর্কের এক অনন্য অধ্যায়।
মসজিদে গামামার দিকে তাকালে তাই মনে হয়, ইতিহাস কখনো পুরোপুরি অতীত হয়ে যায় না। কখনো কখনো একটি স্থানই হয়ে ওঠে সেই ইতিহাসের নীরব বাহক। মদিনার পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদও তেমনই, যার নামের মধ্যেই যেন আজও ভেসে আসে সেই মেঘের স্মৃতি।