হুথির চাপে সৌদি, কোথায় 'বন্ধু' পাকিস্তান-তুরস্ক?

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সামরিক হামলায় নতুন করে চাপে পড়েছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্ত করার ঘটনায় রিয়াদের জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর মধ্যেই সৌদি আরবকে সম্ভাব্য হুথি হামলা মোকাবিলায় গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তবে বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিক সামরিক সহযোগিতা বা সৌদি-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা চুক্তিতে রূপ নেয়নি। 'দ্য জেরুজালেম পোস্ট'-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম-এর মধ্যস্থতায় সৌদি ও ইসরায়েলি পক্ষের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সৌদি আরব বা ইসরায়েল কোনো পক্ষই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।

বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রযাত্রা

সাম্প্রতিক কয়েক দিনে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১১ সেপ্টেম্বর হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মুখে অবস্থিত কৌশলগত পেরিম বা মায়ুন দ্বীপে পৌঁছেছে বলে ইয়েমেনি সরকারি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে। একই সময়ে তারা দ্বীপটির বিপরীত উপকূলের ধুবাব এলাকাতেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এর আগে হুথিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর চলে যাওয়ায় বাব আল-মান্দেব ঘিরে তাদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই প্রণালীটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ।

সৌদি তেল সরবরাহে বাড়ছে ঝুঁকি

বাব আল-মান্দেব সৌদি আরবের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে সৌদি তেল লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর মাধ্যমে পশ্চিমা বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রে এ রুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় ওই বিকল্প রপ্তানি পথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এপি জানিয়েছে, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার কারণে জাহাজ চলাচল কমেছে এবং সৌদি আরবকে তেল পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

একই সময়ে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। ফলে দেশটির তেল সরবরাহব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে একাধিক চাপ তৈরি হয়েছে।

বন্ধু’ পাকিস্তান-তুরস্কের অবস্থান কী?

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। ওই চুক্তিতে বলা হয়, দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরপর ২০২৬ সালের আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটির উদ্দেশ্য ছিল পারস্পরিক প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা।

কিন্তু হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার পর এখন পর্যন্ত পাকিস্তান বা তুরস্ক সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি ইয়েমেনে সামরিক অভিযানে নামেনি।

তবে এটিকে সরাসরি ‘সৌদিকে ছেড়ে দেওয়া’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বলা যায় না। পাকিস্তান সৌদি আরবের ওপর হুথি হামলার নিন্দা করেছে এবং রিয়াদের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একইভাবে তুরস্কও হুথিদের হামলার নিন্দা করেছে।

রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাকিস্তান একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা অংশীদার এবং ইরান-হুথি সংঘাতের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে। ইসলামাবাদ ইরানের কাছে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বার্তাও পৌঁছেছে।

তাহলে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ কেন?

এখানেই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দিকটি সামনে এসেছে।

ইসরায়েলের জেরুজালেম পোস্ট ১৫ সেপ্টেম্বর জানায়, সেন্টকম-এর মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে হুথিদের মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনে আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, রিয়াদকে হুথিদের সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে হুথি ইস্যুতে এই ধরনের সম্ভাব্য নিরাপত্তা যোগাযোগ আঞ্চলিক কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা সৌদি আরবকে রক্ষায় ইসরায়েল সরাসরি যুদ্ধে নামছে, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি যুদ্ধে যেতে চাইছে না

সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে। রিয়াদ ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সহায়তা চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি নতুন সামরিক অভিযানে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এপি জানিয়েছে, সৌদি আরব বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরসহ সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা ও আঞ্চলিক অংশীদারদের কাছে সহায়তা চাইছে। এখন পর্যন্ত কোনো দেশই সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে যোগাযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রয়টার্স জানিয়েছে, সম্প্রতি ওমানে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হুথি প্রতিনিধিদের একটি গোপন বৈঠক হয়েছে। সেখানে হুথিরা মার্কিন জাহাজে হামলা না করার এবং ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সৌদির সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে একই সঙ্গে তিনটি সংকট সামলাতে হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখা।

হুথিদের হাতে পেরিম দ্বীপ ও মোখা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় বাব আল-মান্দেবের ওপর তাদের চাপ বেড়েছে। রয়টার্স-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অগ্রগতি সৌদি আরবের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে এবং রিয়াদের সামনে সামরিক বিকল্পও সীমিত করে দিয়েছে।

নতুন সমীকরণে মধ্যপ্রাচ্য

হুথিদের অগ্রযাত্রা শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সংঘাতকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যায়নি; এটি মধ্যপ্রাচ্যের জোট ও নিরাপত্তা সমীকরণকেও জটিল করছে।

একদিকে সৌদি আরব-পাকিস্তান-তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহযোগিতার আলোচনা সামনে এসেছে।

তবে পাকিস্তান বা তুরস্ক সৌদি আরবকে ‘ফেলে পালিয়েছে’ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই। একইভাবে ইসরায়েল সৌদি আরবের ‘নতুন মিত্র’ হয়ে গেছে এমন দাবিও নিশ্চিত নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য মূলত নিন্দা, কূটনৈতিক সমর্থন, সামরিক সহায়তা চাওয়া এবং সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহযোগিতার আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই বাব আল-মান্দেব ও সৌদি তেল অবকাঠামোর ওপর হুথিদের চাপ আরও বাড়লে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের বাস্তব সহায়তা দেবে, আর ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি নিরাপত্তা যোগাযোগ কতটা এগোয়।