যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তেহরানে লাখো মানুষের ‘প্রতিরোধ’ সমাবেশ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে সবচেয়ে বড় সরকারপন্থী জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এই সমাবেশে লাখো মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নতুন গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীও প্রদর্শন করা হয়, যাদের সীমিত সামরিক ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

তেহরানের কেন্দ্রীয় সড়কে সামরিক পোশাকে স্বেচ্ছাসেবীরা মিছিল করেন। তাদের কারও হাতে ছিল ইরানের পতাকা, আবার কারও হাতে অস্ত্র। সমাবেশে ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামও প্রদর্শন করা হয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, রাজধানীর এই সমাবেশে ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে এই উপস্থিতির সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) তেহরান শাখার প্রধান হাসান হাসানজাদেহ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে জানিয়েছেন, নতুন ‘জানফাদা-ই-ইরান’ স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচিতে এরই মধ্যে ৬ লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন।

‘জানফাদা-ই-ইরান’ শব্দটির অর্থ মোটামুটি ‘ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গকারীরা’। কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, এই কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ নিতে একসময় ১০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেবেন।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন বাহিনীটি আইআরজিসি ও বাসিজ মিলিশিয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। তাদের সামরিক ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সমাবেশে বাসিজের প্রধান হোসেইন তাইয়েব বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা ‘পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষার’ জন্য প্রস্তুত থাকবে। তিনি তাদের ইরানের শত্রুদের জন্য ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে ওঠার কথা বলেন।

সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইরানি সরকারের ভাষ্য, নতুন স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন কেবল সামরিক প্রস্তুতির বিষয় নয়; এর মাধ্যমে যুদ্ধের সময়ে দেশের অভ্যন্তরে ঐক্য ও সংহতির বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।

সমাবেশে নারী ও কিশোর-কিশোরীদেরও স্বেচ্ছাসেবী ইউনিটে নিবন্ধনের কথা জানানো হয়েছে। একজন স্বেচ্ছাসেবী আল জাজিরাকে বলেন, তারা যুদ্ধ চান না, তবে দেশের প্রতিরক্ষায় শেষ পর্যন্ত প্রস্তুত থাকতে চান।

শুক্রবারের এই সমাবেশকে ইরানের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিক দুই ধরনের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তেহরানের প্রতিরোধের অবস্থান তুলে ধরেছে; অন্যদিকে যুদ্ধের সময়ে সরকারের প্রতি অভ্যন্তরীণ সমর্থন প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সমাবেশকে সংহতির প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেন। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এর বার্তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরেও যেকোনো সংকটে জনগণ প্রস্তুত রয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশটির জনগণকে জাতীয় প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সংগঠিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

এই সমাবেশ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইরানের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধজনিত চাপের মুখে রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপকে ‘নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশে সহায়তা করার অভিযোগে ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক কয়েকটি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়।

ইরানের অর্থনৈতিক সংকট গত ডিসেম্বরের বিক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল। ওই বিক্ষোভ দ্রুত দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে রূপ নেয়। নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইরানি সরকার ও আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে সরকার প্রায় ৩ হাজার নিহতের কথা বললেও আন্দোলনকারীরা ৭ হাজারের বেশি নিহতের দাবি করেছে। এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর ইরানি সরকার নিজেদের দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। একই সময়ে শুরু হয় নতুন স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীতে জনসম্পৃক্ততার প্রচারাভিযান।

ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, সম্ভাব্য সামরিক মোতায়েনের জন্য ৩ কোটির বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন যা দেশটির প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে এই নিবন্ধনের সংখ্যা ও এর প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

তেহরানের সর্বশেষ সমাবেশ তাই শুধু একটি জনসমাবেশ নয়; যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরান কীভাবে সামরিক প্রস্তুতি, অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং জনসম্পৃক্ততাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে চাইছে, তারও একটি প্রকাশ্য চিত্র হিসেবে সামনে এসেছে।