যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইরান। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলী জেইনিভান্দ জানিয়েছেন, যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক ভবন, সরকারি সেবাকেন্দ্র ও অন্যান্য জরুরি অবকাঠামো মেরামতকে অপ্রয়োজনীয় সরকারি প্রকল্পের তুলনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
জেইনিভান্দ বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী কর্মসূচিতে ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনই সরকারের ‘শীর্ষ অগ্রাধিকার’। বাড়িঘরের পাশাপাশি পুলিশ স্টেশন ও জনসেবামূলক স্থাপনাও দ্রুত মেরামতের আওতায় আনা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৭৫ হাজার আবাসিক ইউনিট
ইরানি কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, শত্রুপক্ষের হামলায় দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে প্রায় ৭৫ হাজার আবাসিক ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন অবকাঠামো এবং সংযোগকারী সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হরমোজগান ও গোলেস্তানসহ কয়েকটি প্রদেশে এসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে ইরানি কর্মকর্তার দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির এই পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। ফলে সংখ্যাটি ইরান সরকারের দেওয়া হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জেইনিভান্দ বলেন, সাধারণ মানুষের বসবাসের ঘরবাড়ি এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সেবার অবকাঠামো সচল করাই এখন সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি ইরান এখন তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখেও রয়েছে। দেশটির ওপর দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত চাপের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, “মূল্যবৃদ্ধি মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে এবং সব কর্মকর্তা এই সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করছেন।”
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনগুলোতেও ইরানে মূল্যস্ফীতির ব্যাপক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। The National-এর ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইয়ে ইরানের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল এবং খাদ্য ও পানীয়ের দাম আগের বছরের তুলনায় ১২৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছিল। আগস্টে শহরাঞ্চলের ভোক্তা মূল্যও এক বছর আগের তুলনায় ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি ছিল।
যুদ্ধের পর অর্থনীতির দ্বৈত চাপ
ইরানের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে কারণ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর পাশাপাশি অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রমও ধরে রাখতে হচ্ছে।
একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর, সেতু, সরকারি স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে নির্মাণসামগ্রী, খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পুনর্গঠনের ব্যয়ও বাড়ছে।
অর্থাৎ একই সময়ে সরকারকে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ সরানো, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষ তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ সাধারণ মানুষের ওপর
ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় দিক হলো আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।
The National জানিয়েছে, রিয়ালের বড় ধরনের অবমূল্যায়নের পাশাপাশি দেশটির শ্রমজীবী মানুষের আয় জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে একজন শ্রমিকের মাসিক আয় প্রায় ৮২ ডলার এবং একটি পরিবারের মৌলিক ভোগব্যয়ের ঝুড়ির মাসিক খরচ প্রায় ৪৫০ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় যুদ্ধের কারণে বাড়িঘর হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুনর্গঠনে কোন কাজ আগে?
জেইনিভান্দের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে মানুষের বসবাসের ঘরবাড়ি এবং জরুরি জনসেবা।
পুলিশ স্টেশনসহ সরকারি সেবা স্থাপনা মেরামত করা হবে। একই সঙ্গে প্রদেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সচল রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু ও অন্যান্য সংযোগ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর অর্থ হলো, যুদ্ধের পর ইরানের পুনর্গঠন পরিকল্পনা শুধু আবাসনকেন্দ্রিক নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনিক সেবা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় সচল করার বিষয়টিও জড়িত।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রায় ৭৫ হাজার আবাসিক ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইরানি সরকারি হিসাব সঠিক হলে পুনর্গঠন হবে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হবে সেতু, সরকারি স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামোর মেরামত।
আর মূল্যস্ফীতি যদি উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে পুনর্গঠনের প্রতিটি ধাপেই ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে। ফলে সরকারের জন্য শুধু অর্থ বরাদ্দ করাই যথেষ্ট নয়; নির্মাণসামগ্রী, জ্বালানি, শ্রম এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ মোকাবিলায়ও সরকারি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
যুদ্ধের সামরিক পর্ব কমে এলেও ইরানের জন্য পরবর্তী লড়াই এখন অর্থনীতি, পুনর্গঠন এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো।