যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা দিয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিশাল সামরিক মিছিল করেছেন আইআরজিসি ও বাসিজের স্বেচ্ছাসেবীরা। দেশটির সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন বলে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা যুদ্ধের কয়েক মাস এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও দেশের প্রতিরক্ষায় অস্ত্র হাতে নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানান।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জানফাদা ইরান’ বা ‘ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গকারীরা’ নামে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রীয় সড়কগুলোতে সামরিক পোশাক পরা স্বেচ্ছাসেবীরা মিছিল করেন এবং বিভিন্ন পতাকা বহন করেন। রাস্তার দুই পাশে থাকা লোকজন তাদের স্বাগত জানান। কিছু অংশগ্রহণকারী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকায় পা রাখেন এবং ‘আমেরিকার মৃত্যু’ ও ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ স্লোগান দেন।
মিছিলের কয়েক দিন আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জনগণকে এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য হামলাকারী রাইফেল ব্যবহারের সীমিত প্রশিক্ষণ শিগগিরই শুরু হবে বলেও জানানো হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব স্বেচ্ছাসেবী আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনীর পাশাপাশি দেশের প্রতিরক্ষায় অতিরিক্ত জনবল হিসেবে কাজ করবেন।
তেহরানের আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল হাসান হাসানজাদেহ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ইতোমধ্যে ৬ লাখের বেশি মানুষ এই কর্মসূচিতে নিবন্ধন করেছেন। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছে কর্তৃপক্ষ। শুক্রবারের মিছিলে রাজধানীতে ৩ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে ইরানি টেলিভিশনের হিসাবে জানানো হয়। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিছিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাসিজের নতুন প্রধান হোসেইন তাইয়েব বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা ‘সমন্বিত প্রতিরক্ষা’র জন্য প্রস্তুত থাকবেন এবং শিগগিরই দেশের অন্যান্য শহরেও একই ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করা হবে। নতুন সদস্যরা ইরানের শত্রুদের জন্য ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে উঠবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সামরিক কমান্ডারসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা মিছিলটি প্রত্যক্ষ করেন।
মিছিলে অংশ নেওয়া ২৪ বছর বয়সী মারজিয়ে আফাকিকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি স্বামী ও ছোট সন্তানকে নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ইরানিরা তাদের মাতৃভূমি নিয়ে দেওয়া হুমকিতে ভয় পায় না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইতিহাসে কেউ ইরান দখল করে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে পারেনি।
কর্মসূচিতে সামরিক সরঞ্জামও প্রদর্শন করা হয়। তেহরানের বিভিন্ন সড়কে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়। কালো মাথার আবরণ পরা নারী আইআরজিসি সদস্যদেরও সামরিক যানবাহনে স্থাপিত মেশিনগানের পাশে দেখা যায়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত ধরনের ড্রোনও প্রদর্শন করে আইআরজিসি।
তেহরানে এই সামরিক কর্মসূচির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার দায়ও ইরান স্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। টোগোর পতাকাবাহী ‘ট্রেন্ড’ নামের জাহাজটিকে প্রণালি দিয়ে ‘অবৈধভাবে’ যাওয়ার চেষ্টার কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানায়, জাহাজটিতে একটি নিক্ষিপ্ত বস্তু আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়, পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ কর্মসূচির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। বাসিজ-সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বিস্তার ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা বাড়াতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জানুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল, যা পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। মানবাধিকারকর্মীরা ওই বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ করেছিলেন।
এর আগে মে মাসে ইরানি সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, দেশটির প্রায় ৯ কোটি মানুষের মধ্যে ৩ কোটির বেশি মানুষ অনলাইন ফরম বা বিভিন্ন জনসমাবেশের মাধ্যমে ‘ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গ’ কর্মসূচিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট