আলোচনায় বসতে প্রস্তুত ইরান, দাদাগিরি মানতে নয়: পেজেশকিয়ান

সমস্যা সমাধানে আলোচনায় বসতে ইরান প্রস্তুত, তবে কোনো ধরনের দাদাগিরি, চাপ বা জবরদস্তি মেনে নেবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, কাউকে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রচারিত মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার পর সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। এতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়সহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তিনি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে, যিনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিকে নিষিদ্ধ করে ধর্মীয় নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাঝপথে থাকা অবস্থায় ইরান হামলার শিকার হয়। তাঁর ভাষ্য, হামলার আগে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সমস্যা সমাধান নয়; বরং ইরানের সরকারকে উৎখাত করা। ইসরায়েলও তাদের বক্তব্যে সরকারকে নিষ্ক্রিয় করার কথা বলেছে বলে দাবি করেন তিনি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, তাঁর দেশ সমস্যা সমাধানে মানবিকভাবে সম্ভব সবকিছুই করছে। তবে চাপ ও জবরদস্তির মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর প্রশ্ন, যখন দুই দেশ ইতোমধ্যে আলোচনা করছে, তখন একই সময়ে ইরানের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে কেন।

হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়ার ইরানি পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন পেজেশকিয়ান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনাটি গ্রহণ করলেই এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট জানান, সাত দিনের ওই পরিকল্পনার লক্ষ্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জুনের মাঝামাঝি সময়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একই। তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পেজেশকিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকেই এই অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের পারমাণবিক সমঝোতা ছিন্ন করেছে এবং ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দুই পক্ষের আলোচনা চলার সময় দুবার ইরানে হামলা চালিয়েছে। এরপর সমঝোতা স্মারকের শর্তও লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, এখন প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে দুই দেশ ঠিক কোন বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। লিখিতভাবে যেসব বিষয়ে সম্মত হওয়া প্রয়োজন, সেগুলো মেনে চলা না হলে সংলাপের মাধ্যমে আদৌ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

পেজেশকিয়ান আরও বলেন, যুদ্ধের কারণে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, প্রথমে তা দূর করতে হবে। লিখিত সমঝোতাগুলো মেনে চলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে হবে যে তাদের ইরানের সরকার বা প্রশাসন উৎখাতের কোনো উদ্দেশ্য নেই।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি তাকে কূটনীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, সব আলোচনা ও সিদ্ধান্ত সমন্বয়ের মাধ্যমেই নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ইরানে সামরিক বাহিনী, সংসদ, প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে ছয় সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে। এই দলের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়নের ক্ষমতা রয়েছে।

নিউইয়র্ক সফরের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি সেখানে গেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে পেজেশকিয়ান ইরানি কর্মকর্তারা যুদ্ধের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে লুকিয়ে ছিলেন, এমন দাবি নাকচ করেন। তিনি জানান, তিনি সক্রিয় ছিলেন, প্রতিদিন কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেছেন এবং মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি