হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করায় তেহরান মোটেও বিস্মিত হয়নি বলে মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রস হ্যারিসন। তাঁর মতে, ইরানের এই উদ্যোগ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ এবং সদিচ্ছার বার্তা দেওয়ার একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হ্যারিসন বলেন, ইরান দেখাতে চাইছে যে তারা আলোচনা ও সমঝোতার জন্য প্রস্তুত। তাঁর মতে, এই বার্তা ইরানের অভ্যন্তরীণ দর্শকদের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মার্কিন জনগণের কাছেও তা পৌঁছে দেওয়া তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ কারণেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানি কর্মকর্তাদের নিউইয়র্ক সফর তাৎপর্যপূর্ণ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার জানিয়েছিলেন, কাতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট সাত দিনের পরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে এবং এরপর পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা শুরু হতে পারে।
হ্যারিসনের মতে, ইরানের নেতৃত্ব সম্ভবত আগে থেকেই ধারণা করেছিল যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। কারণ নতুন সাত দিনের পরিকল্পনাটি মূলত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (MoU) দ্রুত বাস্তবায়নের প্রস্তাব।
জুনের ওই সমঝোতা পরবর্তী সময়ে ভেঙে যায়। নতুন পরিকল্পনায় সেই চুক্তির কিছু শর্ত দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ও হরমুজে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
হ্যারিসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ধারণা—যুক্তরাষ্ট্র জুনের সমঝোতার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। ফলে ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান তেহরানের কাছে খুব একটা অপ্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়।
আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। ওয়াশিংটনের এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাবের জবাব দিতে তাড়াহুড়ো করছে না।
হ্যারিসনের বিশ্লেষণে, জুনের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর ইরান দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রথমটি হলো যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ দিয়ে যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হতো। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
হ্যারিসন বলেন, তেহরান ইতোমধ্যে জাহাজগুলোকে ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলাচলের মাধ্যমে প্রণালিতে নৌপরিবহন চালু রাখার চেষ্টা করেছে। তবে তাঁর মতে, ইরানের লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ খুলে দেওয়া নয়; যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এই জলপথ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও তারা এখন থেকেই নির্ধারণ করতে চাইছে।
হ্যারিসনের বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য একটি টোল বা ফি-ভিত্তিক ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের চিন্তা।
তাঁর মতে, তেহরান যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় হরমুজের ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার কোনো কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এ জন্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চালানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এই সম্ভাব্য ‘টোল কাঠামো’ সম্পর্কে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত নীতিমালা বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে বর্তমানে একজন আঞ্চলিক বিশ্লেষকের মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ইরানের সাত দিনের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ের মতো বিষয় রয়েছে। বিনিময়ে তেহরান হরমুজ খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইতোমধ্যে বলেছেন, আগের আলোচনা ও পরবর্তী হামলা-নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতার কারণে ওয়াশিংটনের ওপর তেহরানের আস্থা কমেছে। ফলে কূটনৈতিক উদ্যোগ চললেও দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে সামরিক উত্তেজনা ও পারস্পরিক হুমকি অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগও চলছে। হ্যারিসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের সাত দিনের প্রস্তাবকে তাই শুধু যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ হিসেবে নয়, হরমুজের যুদ্ধ-পরবর্তী নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।