বেসামরিক জাহাজে হামলার অভিযোগে রেকর্ডসংখ্যক ১৪৬টি দেশ ইরানের নিন্দা জানিয়েছে বলে দাবি করেছেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ। তাঁর মতে, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ইরান ক্রমেই আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজ বলেন, গত ১৩ দিনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল বেসামরিক জাহাজে হামলার অভিযোগ মোকাবিলা করা।
তিনি বলেন, “রেকর্ডসংখ্যক ১৪৬টি দেশ এসব কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।” ওয়াল্টজের বক্তব্য অনুযায়ী, বেসামরিক নৌযানে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে।
‘হতাশার কর্মকাণ্ড’ বলছে ওয়াশিংটন
ইরানের সামুদ্রিক তৎপরতাকে ‘হতাশার কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ওয়াল্টজ। তাঁর দাবি, সামরিক চাপের পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও ক্রমেই বাড়ছে।
এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে সামনে রেখে ওয়াল্টজ বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দাব, সুয়েজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবাধ বাণিজ্য ও নৌচলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে দেশটির কর্মকাণ্ডকে জলদস্যুতার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলকে ঘিরে ইরানের কর্মকাণ্ড শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও পড়ছে।
হরমুজ নিয়ে বাড়ছে উত্তেজনা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। যুদ্ধের সময় জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। আল জাজিরার হিসাবে, যুদ্ধের প্রথম ১০০ দিনে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে যায়।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে একাধিক হামলা ও উত্তেজনার খবর এসেছে। এর ফলে জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরান অবশ্য হরমুজকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও অবরোধের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে আসছে। তেহরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা প্রস্তুত। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথা জানিয়েছেন, যদিও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।
অর্থনৈতিক চাপের কথাও বললেন ওয়াল্টজ
ওয়াল্টজের বক্তব্যে সামরিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থার কথাও উঠে এসেছে। তিনি দাবি করেন, মার্কিন চাপের ফলে ইরানের মুদ্রার মূল্য কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও তেল থেকে আয় কমেছে।
তবে এসব মূল্যায়ন মূলত মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য। ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ, জ্বালানি রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রভাব নিয়ে স্বাধীন বিশ্লেষণও রয়েছে।
ওয়াশিংটন বলছে, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনায় আনাই তাদের কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য। অন্যদিকে তেহরান হরমুজ, তেল রপ্তানি ও সামরিক সক্ষমতাকে আলোচনায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ১৪৬ দেশের নিন্দার দাবি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলেও, কোন কোন দেশ কোন নির্দিষ্ট প্রস্তাব বা বক্তব্যের মাধ্যমে ইরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে সে বিষয়ে ওয়াল্টজের বক্তব্যে বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হয়নি। ফলে সংখ্যাটি তাঁর দাবির হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে তেহরান হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও এর প্রভাব অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।