ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিমান অবরোধ ভাঙতে সব ইরাকিকে তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন ইরাকের ইসলামি সুপ্রিম কাউন্সিলের প্রধান শেখ হুমাম হামুদি। তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই অবরোধে সামরিক, অর্থনৈতিক বা প্রচারমূলক, যেকোনো ধরনের অংশগ্রহণ ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে এক বক্তব্যে হামুদি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধে কোনো ধরনের অংশগ্রহণই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি এ ধরনের অংশগ্রহণকে ‘হারাম’ বা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরানের বিমান চলাচল খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অন্যায্য ও অমানবিক’ বলে আখ্যা দেন হামুদি। তার দাবি, এই অবরোধ আন্তর্জাতিক আইন এবং ইরাকের সংবিধান লঙ্ঘন করছে। বিশেষ করে ইরাকের সংবিধানের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই অনুচ্ছেদে ইরাকের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের ২৭টি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এসব বিমান সংস্থার সঙ্গে কাজ করা বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী, ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও গৌণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে বলে জানানো হয়।
এরপর ইরানের সঙ্গে বিমান চলাচলে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করে ইরাকের বিভিন্ন বিমানবন্দর। ইরানের সঙ্গে এখনো বিমান চলাচল চালু থাকা ইরাকের সর্বশেষ বিমানবন্দর নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ২টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ফ্লাইট স্থগিত করে। সরকারি নির্দেশনার ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
এর আগে এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সুলাইমানিয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়। কিরকুক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে তাদের কোনো ফ্লাইট নেই।
তেহরানে নিযুক্ত ইরাকের রাষ্ট্রদূত ইয়াসের আল-হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ইরান ও ইরাকের মধ্যে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক করতে বাগদাদ জোরালো আলোচনা চালাচ্ছে। তিনি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ফ্লাইট স্থগিতের ঘটনাকে ‘সাময়িক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
হাজ্জাজ বলেন, ফ্লাইট স্থগিতের কারণে ইরাক ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা ও শক্ত ভিত্তি কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে ইরাক সরকার কূটনৈতিক ও কারিগরি পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
বিমান চলাচল বন্ধের মানবিক ও সামাজিক প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন ইরাকি রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ইরাক ও ইরানের মধ্যে বিমান চলাচল পুনরায় চালু করা শুধু পর্যটন ও বাণিজ্যিক যাতায়াতের বিষয় নয়; ইরাকের বিপুলসংখ্যক নাগরিক নিয়মিত ইরান সফরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রার বিষয়ও সরাসরি জড়িত।
হাজ্জাজ বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে ইরাক সরকার ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলোচনা ও সমন্বয় চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ফ্লাইট স্থগিতের কারণে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যায়।
ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইনও আল আরাবিয়াকে জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে বাগদাদ। ইরানের বিমান সংস্থাগুলোকে সেবা দেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার লক্ষ্যেই এ আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।
ইরাকের বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতাও ইরানের সঙ্গে বিমান চলাচল স্থগিতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদি বলেন, ইরান ইরাকের ‘প্রতিবেশী, মিত্র ও বন্ধু’। বিমানবন্দর বন্ধের সিদ্ধান্তকে তিনি বড় ভুল হিসেবে উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
এদিকে হারাকাত হিজবুল্লাহ আল-নুজাবা আন্দোলনের মহাসচিব আক্রাম আল-কাবি শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, ইরাকের বিমানবন্দরগুলোতে দেশজুড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে তাদের সংগঠন। ইরাক ও ইরানের মধ্যে স্বাভাবিক বিমান চলাচল পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে বলে জানান তিনি।
এর আগে সংগঠনটি জানিয়েছিল, ইরানের ওপর বিমান অবরোধের প্রতিবাদে ইরাকের বিভিন্ন বিমানবন্দরে অবস্থান কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সূত্র: প্রেস টিভি