ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এর বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রার মুখে পশ্চিম উপকূলের আল-খোখা থেকে পালিয়ে একটি ইয়েমেনি পরিবার প্রায় এক সপ্তাহ সড়কপথে ঘুরে অবশেষে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মুকাল্লায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সঙ্গে ছিল আরও একটি আত্মীয় পরিবার।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৮ বছর বয়সী সাঈদ হাসান ও তার ভাই মোহাম্মদের পরিবার ৯ সেপ্টেম্বর আল-খোখা ছাড়ে। এর আগে তারা দেখতে পান, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম ওই এলাকা থেকে সরে যাচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কায় তারা বাড়ি ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সেনা প্রত্যাহার দেখে পালানোর সিদ্ধান্ত
সাঈদের দুই ছেলে প্রথমে বাড়িতে এসে বাবাকে জানায়, ফ্রন্টলাইন থেকে অস্বাভাবিকভাবে সেনারা সরে যাচ্ছে। সাঈদ প্রথমে ধারণা করেছিলেন, এটি হয়তো সাময়িক বা কৌশলগত প্রত্যাহার। কিন্তু পরে নিজ চোখে বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরে যেতে দেখে তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন।
একই সময়ে কাছাকাছি বাস্তুচ্যুতদের একটি শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সাঈদের ভাই মোহাম্মদের ছেলে শাকার ঘটনাস্থল দেখতে গিয়ে পরপর বিস্ফোরণের মধ্যে পড়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায়।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় হুথিরা হোদেইদা ও তাইজের পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছিল। ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি বাহিনী মোখা থেকে সরে যায় এবং হুথিরা উপকূলীয় কয়েকটি এলাকায় অগ্রসর হয়।
রাতের অন্ধকারে শুরু হয় পালানো
সাঈদ, তার স্ত্রী, দুই ছেলে, পুত্রবধূ, মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে একটি ছোট পিকআপে রওনা দেন। অন্য গাড়িতে ছিলেন মোহাম্মদ, তার স্ত্রী, এক আত্মীয় এবং পরে পথ থেকে তুলে নেওয়া আরও তিনজন।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারা যাত্রা শুরু করেন। তখনও তারা জানতেন না, তাদের বাড়িতে আর ফিরে যাওয়া কতটা কঠিন হবে।
পথে তারা দেখতে পান, বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির মধ্যে সেনারা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ফেলে পালাচ্ছেন। কোথাও নতুন কামান পড়ে রয়েছে, কোথাও পড়ে আছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ। পরিবারের সদস্যরা পরে জানান, রাস্তায় নিহত সেনাদের মরদেহও দেখতে হয়েছে তাদের।
অন্যদিকে, তাদের নিজেদের বাড়িগুলোও নিরাপদ থাকেনি। পরিবার দুটির দাবি, তারা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাদের ধাতব পাত ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ঘরগুলো খুলে নিয়ে যায় এবং সেখানে থাকা কিছু মালপত্রও হারিয়ে যায়।
পানি-খাবার ছাড়াই দীর্ঘ যাত্রা
পালানোর সময় পরিবারগুলোর কাছে পর্যাপ্ত পানি বা খাবার ছিল না। তারা ভেবেছিল, পথে দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নেবে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে অধিকাংশ দোকান বন্ধ কিংবা খালি হয়ে গিয়েছিল।
মোহাম্মদের গাড়ির একটি টায়ার নষ্ট হয়ে গেলে বিপদ আরও বাড়ে। তাকে গাড়ি থামিয়ে টায়ার বদলাতে হয়। বিস্ফোরণের শব্দ ক্রমেই কাছে আসছিল বলে সঙ্গে থাকা লোকজন দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল।
মোখায় পৌঁছে সাঈদ দেখেন, শহর প্রায় জনশূন্য। পিছু হটা সেনাদের গাড়ি শহর এড়িয়ে সরাসরি দক্ষিণের এডেনের দিকে যাচ্ছে। তিনি সেই বহরের পেছনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পথে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহত সেনাদের মরদেহ, পরিত্যক্ত অস্ত্র এবং গোলাবারুদ দেখতে পান। আতঙ্কিত অনেক সেনাকে পোশাক খুলে ফেলতে বা অস্ত্র ফেলে দিতে দেখা যায়।
৩০০ কিলোমিটার পথ, তবু থামেনি গাড়ি
সাঈদ ও মোহাম্মদের গাড়িতে পর্যাপ্ত জ্বালানি ছিল না। গ্যাসের মজুত প্রায় শেষ হয়ে এলেও তারা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আল-খোখা থেকে এডেনের দিকে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
১০ সেপ্টেম্বর এডেনের কাছে পৌঁছে সাঈদের পরিবার একটি স্কুলে আশ্রয় নেয়। সেখানে আটটি পরিবারকে একটি কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছিল। পুরুষদের বাইরে থাকতে বলা হলে সাঈদ পরিবারের সদস্যদের ভেতরে রেখে নিজে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান।
মোহাম্মদও এডেনের কাছে পৌঁছে খাবার ও পানির সংকটে পড়েন। এক সেনা তাদের দুরবস্থা দেখে এক বোতল পানি দেন।
আরও চার দিন পর মুকাল্লায়
১২ সেপ্টেম্বর দুই ভাই এডেনের পূর্বদিকে আবিয়ান গভর্নরেটে যান এবং এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। জ্বালানি না থাকায় সেখানে আরও দুই দিন অপেক্ষা করতে হয়।
১৪ সেপ্টেম্বর তারা আবার যাত্রা শুরু করেন। পরদিন শাবওয়া গভর্নরেটের হুরা এলাকায় সাঈদের গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। রাতে স্থানীয় এক মেকানিককে ঘুম থেকে তুলে গাড়ি মেরামত করাতে হয়।
অবশেষে ১৬ সেপ্টেম্বর, বাড়ি ছাড়ার এক সপ্তাহ পর, দুই পরিবার মুকাল্লার পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছায়। সেখানে তারা তিন কক্ষের একটি বাসা ভাড়া নেয়। মাসিক ভাড়া ৪০০ সৌদি রিয়াল। এর সঙ্গে সমপরিমাণ জামানত এবং ২০০ রিয়াল কমিশন দিতে হয়েছে।
কিন্তু নতুন আশ্রয়ও তাদের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আনেনি। দুই সপ্তাহ পার হলেও দুই ভাই কেউই কাজ পাননি। সঞ্চিত অর্থ দিয়েই কোনোভাবে দিন কাটছে তাদের।
মোহাম্মদ বলেন, কখনো খাবার না খেয়ে অর্থ বাঁচাতে হচ্ছে। তিনি দিনমজুর হিসেবে যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত মৌচাকের কাজ, খেজুরগাছে ওঠা কিংবা পাথর বহন করা যা পাওয়া যায় তাই করতে চান।
বাস্তুচ্যুত প্রায় দুই লাখ মানুষ
ইয়েমেনের বাস্তুচ্যুতদের ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সরকারি ইউনিটের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯০৬ জন, অর্থাৎ ২৯ হাজার ৫১৯ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। সবচেয়ে বেশি মানুষ তাইজ গভর্নরেটে আশ্রয় নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সাম্প্রতিক সহিংসতা ঠেকাতে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মাসকাটে এবং সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এপি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হুথি অগ্রযাত্রার পর ইয়েমেনে নিহত ও আহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
এদিকে রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব হুথিদের কাছ থেকে বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্যে ইয়েমেনি বাহিনীকে দিয়ে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। পরিকল্পনাটির সময়সূচি ও পরিসর এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ঘর হারানোর পরও ঋণের বোঝা
মোহাম্মদের স্ত্রী ফাতিমার কাছে অবশ্য সবচেয়ে বড় চিন্তা বাসা বা খাবার নয়। তার উদ্বেগ পোশাক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ইয়েমেনি রিয়ালের ঋণ।
যুদ্ধের কারণে ব্যবসা, ঘরবাড়ি ও জীবিকা সবকিছু হারানোর পরও সেই ঋণ পরিশোধের চিন্তা তাকে তাড়া করছে।
ইয়েমেনের এই পরিবারের গল্পটি তাই শুধু একটি সামরিক অভিযানের গল্প নয়। এটি যুদ্ধের মুখে সাধারণ মানুষের ঘর হারানো, খাদ্য ও পানির সংকট, দীর্ঘ পথ পাড়ি, কাজ হারানো এবং ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার সংগ্রামেরও প্রতিচ্ছবি। সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও মৌলিক সহায়তার প্রয়োজনও তত বাড়ছে।