ব্রিটেনে তিন ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রস্তুতির অভিযোগ

ব্রিটেনে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তা এবং অন্তত একজন সাংবাদিকের ওপর গুরুতর সহিংসতার প্রস্তুতির লক্ষ্যে নজরদারি চালানোর অভিযোগ উঠেছে তিন ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (০৭ অক্টোবর) লন্ডনের উলউইচ ক্রাউন কোর্টে মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, মোজতবা পুরমোহসেন ও কামবিজ হোসেইনিসহ ইরানি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের ওপর কয়েক মাস ধরে নজরদারি চালান মোস্তফা সেপাহভান্দ, ফরহাদ জাভাদি মানেশ ও শাপুর কালেহালি খানি নুরি। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানের ছবি ও ভিডিও ধারণ, লক্ষ্য ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত এবং তাদের চলাফেরা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে।

তিনজনের বিরুদ্ধেই ২০২৩ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাটি ইরানি। সেপাহভান্দের বিরুদ্ধে নিজে গুরুতর সহিংসতা চালানোর উদ্দেশ্যে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জাভাদি মানেশ ও নুরির বিরুদ্ধে অন্য কারও মাধ্যমে এমন সহিংসতা সংঘটনে সহায়তার উদ্দেশ্যে নজরদারি চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী উইলিয়াম এমলিন জোন্স আদালতে বলেন, তিন আসামির কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবেই এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। তার দাবি, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এক বা একাধিক লক্ষ্য ব্যক্তির ওপর গুরুতর সহিংসতা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া।

ফোনেই মিলেছে নজরদারির তথ্য

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সেপাহভান্দের মোবাইল ফোনে মোজতবা পুরমোহসেনের ঠিকানা খুঁজে বের করার চেষ্টা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তার ঠিকানা জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি সেবায় করা অনুসন্ধানের তথ্যও ছিল। তবে সেখান থেকে পুরমোহসেনের বাড়ির ঠিকানা পাওয়া যায়নি বলে আদালতকে জানানো হয়।

তদন্তকারীরা সেপাহভান্দের ফোনে পুরমোহসেনের ছবি, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানের তথ্য এবং এসব অবস্থান নিয়ে তৈরি একটি নথিও পেয়েছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে। এর মধ্যে ইরানি সংবাদমাধ্যমটির মূল প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা এবং লন্ডনের একটি হোটেলের তথ্য ছিল। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর ২০২৪ সালের বড়দিনের সময় পুরমোহসেন ওই হোটেলে অবস্থান করেছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়।

এ ছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পুরমোহসেন যে আবাসিক ভবনে থাকতেন, সেই স্থানটির ছবি ও ভিডিওও আসামিদের কাছে পাওয়া গেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে। তদন্তকারীদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর সেপাহভান্দ ও জাভাদি মানেশ ওই এলাকার কাছাকাছি ছিলেন। পরে জাভাদি মানেশ সেপাহভান্দকে ওই আবাসিক ভবনের ছবি ও ভিডিও পাঠান বলে আদালতে জানানো হয়।

নজরদারির অভিযোগে আরেক ব্যক্তির নাম

রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের বাইরেও আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি ইসরায়েলপন্থী আইনজীবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা জোনাথন টার্নারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকানা এবং তার আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের ছবি সেপাহভান্দ জাভাদি মানেশকে পাঠিয়েছিলেন বলে আদালতকে জানানো হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে থাকা আরও একজন ব্যক্তিকে ঘিরে ওই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে যে উদ্দেশ্য ছিল, এই ব্যক্তির ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ভিন্ন ছিল বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

চাপের মুখে কাজ করার দাবি সেপাহভান্দের

অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তিন আসামি ভিন্নভাবে অস্বীকার করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, সেপাহভান্দ নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের কথা স্বীকার করলেও দাবি করছেন, তিনি ইরানের স্বার্থে কাজটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং কাজটি না করলে পরিণতি নিয়ে তিনি ভয় পেতেন। তার আরও দাবি, ইরানি গোয়েন্দারা যাতে প্রত্যাশিত সহায়তা না পায়, সে জন্য তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কাজটি দুর্বলভাবে করেছিলেন।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। আদালতে উপস্থাপিত বার্তাগুলোতে সেপাহভান্দের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা এবং কাজের বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

অন্য দুই আসামি জাভাদি মানেশ ও নুরি সংশ্লিষ্ট স্থানে যাওয়া এবং ছবি ও ভিডিও ধারণের কথা স্বীকার করলেও দাবি করছেন, এসব কর্মকাণ্ড ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, এ বিষয়ে তারা জানতেন না।

তিনজনকেই ২০২৫ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার পর এই তিনজনই প্রথম ইরানি নাগরিক, যাদের ওই আইনের অধীনে অভিযোগ আনা হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়।

মামলাটির শুনানি ছয় থেকে আট সপ্তাহ চলতে পারে। শেষ পর্যন্ত তিন আসামি নজরদারির উদ্দেশ্য সম্পর্কে কী জানতেন এবং তাদের কর্মকাণ্ড ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তা ও গুরুতর সহিংসতার প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা আদালতের জুরিরাই নির্ধারণ করবেন। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল