সৌদির নিরাপত্তায় অন্যের কাছে ভিক্ষা কেন: পাকিস্তানকে ইরানের প্রশ্ন

সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে কেন, পাকিস্তানকে ঘিরে এমন প্রশ্ন তুলেছে ইরান। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোট কার্যকর হওয়ার পর তেহরানের আপত্তির কেন্দ্রে উঠে এসেছে সৌদি ভূখণ্ডে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা। ইরানি কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তান যদি ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরবের সামরিক সহযোগী হয়ে ওঠে, তাহলে তার নিরপেক্ষতা আর কতটা গ্রহণযোগ্য থাকবে? একই সঙ্গে তেহরান সতর্ক করেছে, ইয়েমেনের সংঘাতে বাইরের দেশগুলোর সামরিক হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

গত ৫ অক্টোবর সৌদি আরবের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিন দেশের প্রতিরক্ষা জোটটি কার্যকর পর্যায়ে প্রবেশ করে। তুরস্ক ও পাকিস্তান জানিয়েছে, সৌদি আরবকে সহায়তা দিতে তারা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। আলোচিত সমঝোতা অনুযায়ী, পাকিস্তানি ও তুর্কি বাহিনীর কাছ থেকে সৌদি আরব সামরিক, কারিগরি ও গোয়েন্দা সহায়তা পেতে পারে। সৌদি ভূখণ্ডের ভেতরে প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা জোরদার করাও এর আওতায় রয়েছে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইয়েমেনে আক্রমণাত্মক অভিযানে এই দুই দেশের বাহিনী অংশ নেবে না।

সৌদি আরবে কয়েক দশ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের খবর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, তারাও এ ধরনের গুঞ্জন শুনেছেন, তবে আশা করেন খবরটি সত্য নয়। ইয়েমেনের বিষয়ে যেকোনো দেশের হস্তক্ষেপ আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ ও কল্যাণের বিরুদ্ধে মক্কা চুক্তির মতো কোনো জোট ব্যবহার করা হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন ইরানি মুখপাত্র।

গত আগস্টে মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ইরানের আপত্তি এখন এই চুক্তির সামরিক কাঠামোর পাশাপাশি ইয়েমেনের সংঘাতে এর সম্ভাব্য ভূমিকা এবং পাকিস্তানের আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানকে ঘিরেও বিস্তৃত হয়েছে।

‘নিরাপত্তার জন্য ভিক্ষা’ নিয়ে সৌদিকে খোঁচা

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সরাসরি প্রতিরক্ষা চুক্তিটির নাম উল্লেখ না করলেও প্রতিবেশী দেশগুলোকে স্বনির্ভরতা ও প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, এ ধরনের চুক্তি ইরানের কর্মকাণ্ডকে সীমিত করতে পারবে না।

ইরানের কয়েকজন আইনপ্রণেতা তিন দেশের জোটকে কার্যত প্রতীকী বলে বর্ণনা করেছেন। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য আহমদ বখশায়েশ চুক্তিটিকে কাগুজে ও রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে অভিহিত করেন। তবে জোটটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন একই কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম রেজাই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগুজে চুক্তি করে সৌদি আরব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একতরফা সুবিধা নিয়েও সৌদি আরব নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। সৌদি নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে তার প্রশ্ন ও আহ্বান, নিরাপত্তার জন্য অন্যদের কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে কেন, বরং নিজেদের নীতি সংশোধন করা উচিত।

রেজাইর বক্তব্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তানীতির পাশাপাশি বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ইরানের সমালোচকদের মতে, নতুন প্রতিরক্ষা জোট সৌদি আরবকে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সমঝোতা ইয়েমেনের সংঘাতে নতুন করে সামরিক সম্পৃক্ততা তৈরি করবে কি না।

জোটটি কার্যকর হওয়ার পর ইরানের সমালোচনার সুর আরও কঠোর হয়েছে। বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি বলেন, আনসারুল্লাহ নামে পরিচিত হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সংঘাতে তুরস্ক ও পাকিস্তান যুক্ত হলেও এতে গোষ্ঠীটির শক্তি কমবে না, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে তাদের তৎপরতাও সীমিত হবে না।

ইরানের ছাত্র সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া বক্তব্যে বোরুজেরদি বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক এই সংঘাতে জড়ালে তা তাদের নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একসময় সৌদি আরব বহু দেশকে নিয়ে জোট গঠন করেছিল, কিন্তু ইয়েমেনে সাত বছর যুদ্ধ করেও পরাজিত হয়েছিল।

মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান কি সংঘাতের পক্ষ হচ্ছে?

তুরস্কের তুলনায় পাকিস্তানকে নিয়েই ইরানের সমালোচনা বেশি তীব্র। এর অন্যতম কারণ, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভূমিকা। ইরানের আইনপ্রণেতা আহমদ নাদেরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদি আরবের পাশে পাকিস্তান দাঁড়ালে দেশটিকে আর নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ থাকবে না। বরং এতে পাকিস্তান আঞ্চলিক সংঘাতের একটি পক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইরানের সংবাদমাধ্যম তাবনাকও পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাকে নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনকে ইরান নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং ইয়েমেনের যুদ্ধে সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর উপস্থিতি মেনে নেবে না। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা দেশটির অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং ইরান-পাকিস্তান সীমান্তেও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংবাদমাধ্যমটি।

রক্ষণশীল ভাষ্যকার হাসান হানিজাদেহ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিভাজন তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন। রিয়াদে সৌদি, পাকিস্তানি ও তুর্কি কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বৈঠককে তিনি অঞ্চলটিতে শিয়া-সুন্নি মেরুকরণ তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে বর্ণনা করেন।

বোরুজেরদি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেছেন। তার মতে, পাকিস্তানের জনগণ বিপ্লবী, মুসলিম এবং এ ধরনের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধে ইসলামাবাদ যুক্ত হলে দেশটির সরকারের সামনে সহজ পথ থাকবে না। ইরানের বক্তব্যে এভাবেই পাকিস্তানের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং তেহরান-ইসলামাবাদ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ একসঙ্গে উঠে এসেছে।

ইরানি সংবাদমাধ্যমে আরও কঠোর সতর্কবার্তা

প্রতিরক্ষা জোটটি কার্যকর হওয়ার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্দেশে হুথি কর্মকর্তাদের দেওয়া সতর্কবার্তাগুলোও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।

তাসনিম সংবাদ সংস্থা এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলেছে, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে সৌদি যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম নূর নিউজ প্রশ্ন তুলেছে, এটি কি মক্কা জোট, নাকি ইয়েমেনের নিপীড়িত জনগণের বিরুদ্ধে জোট?

বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে তাসনিম সতর্ক করে বলেছে, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ ইয়েমেনে হামলায় অংশ নিলে তাদের জাহাজ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এমনকি নিজস্ব ভূখণ্ডও হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এটি সংবাদমাধ্যমটির সতর্কবার্তা; তুরস্ক ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে কোনো নিশ্চিত ঘটনার বিবরণ নয়।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর নির্ভরতার প্রশ্ন তুলে ইরান নতুন প্রতিরক্ষা জোটের সামরিক কার্যকারিতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, দুই দিকেই আপত্তি জানাচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তেহরানের প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত, সৌদি আরবের সামরিক সহযোগী হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের ভূমিকা কীভাবে বজায় থাকবে? ইয়েমেনের সংঘাতকে ঘিরে এই দ্বন্দ্ব এখন শুধু তিন দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক কূটনীতি, সামরিক ভারসাম্য এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ঘিরে উত্তেজনার প্রশ্নও। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল