সমুদ্রতলের ইন্টারনেট তার কাটার হুমকি ‘স্টারলিংকের জন্য সেরা বিজ্ঞাপন’

পারস্য উপসাগরে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি নিয়ে ইরানের ভেতরেই বিদ্রূপ ও সমালোচনার মুখে পড়েছেন দেশটির কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও কট্টরপন্থী ব্যক্তিত্ব। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, আবার যুদ্ধ শুরু হলে অঞ্চলটির যোগাযোগের তার, তথ্যকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এরপর আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তাবকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পাঠকদের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভের পাশাপাশি ব্যঙ্গও দেখা গেছে। অনেকেই সমুদ্রতলের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তাবকে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের জন্য ‘সেরা বিজ্ঞাপন’ বলে অভিহিত করেন।

ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদপত্র কায়হানের সম্পাদক এবং প্রকাশনাটিতে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হোসেইন শরিয়তমাদারি এ হুমকির প্রতি সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ফাইবার-অপটিক তার কেটে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে তাঁর এ প্রস্তাবকে অনেক পাঠক ইরানের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপে ইরান আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এবং দেশটির নিজস্ব ইন্টারনেট সংযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এক পাঠক মন্তব্য করেন, ইন্টারনেটের তার কাটার হুমকির পরিণতি হরমুজ প্রণালি নিয়ে নেওয়া পদক্ষেপের মতো হতে পারে, পুরো অঞ্চলে ইন্টারনেট থাকবে, শুধু ইরানই সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ব্যঙ্গ করে তিনি আরও বলেন, হয়তো এটাই তাদের উদ্দেশ্য। আরেক পাঠক সমুদ্রতলের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তাবকে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের জন্য ‘সেরা বিজ্ঞাপন’ বলে অভিহিত করেন।

প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন
শরিয়তমাদারির প্রস্তাবের সমালোচনায় অনেক পাঠক তাঁর প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। সোমবার তিনি দাবি করেছিলেন, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে প্রায় সাতটি বড় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট তারের ব্যবস্থা গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব তারের সামান্য ক্ষতিও বাণিজ্যিক, ব্যাংকিং, সামরিক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট যোগাযোগের ৮০ শতাংশের বেশি অকার্যকর করে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

তবে পাঠকদের একাংশ তাঁর এই বক্তব্যের প্রযুক্তিগত ভিত্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। একজন ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, তাঁকে তার কাটার যন্ত্র দিয়ে দেওয়া হোক, কারণ তিনি শক্তি দেখাতে তার কাটতে চান। আরেকজন প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি আদৌ ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জানেন কি না।

সমালোচকদের আরেকটি বড় অংশ মনে করেন, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি উল্টো ইরানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিতে পারে। স্টারলিংক নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট এবং বিশেষ টার্মিনালের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দেয়। ফলে প্রচলিত স্থানীয় তারযুক্ত বা মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই এ সেবা ব্যবহার করা সম্ভব।

ফিরুজকুহের এক পাঠক মন্তব্য করেন, ইন্টারনেট বন্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষ যখন তার কাটার যন্ত্র হাতে নেবে, ততক্ষণে ইলন মাস্ক স্টারলিংক চালু করে দেবেন। তাঁর মতে, শরিয়তমাদারির মন্তব্যই ইরানে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্টারলিংককে আরও উৎসাহিত করতে পারে। আরেকজন ব্যঙ্গ করে বলেন, স্টারলিংকও নিশ্চয়ই এই উদ্যোগকে সমর্থন করবে।

উন্নয়ন না করে অবকাঠামো ধ্বংসের প্রস্তাব?
সমালোচনার আরেকটি দিক ছিল ইরানের উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রশ্ন। কয়েকজন পাঠক শরিয়তমাদারির প্রস্তাবের সঙ্গে দেশের উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার তুলনা টেনে প্রশ্ন তোলেন, সমুদ্রের তলদেশে ইন্টারনেটের তার কাটার হুমকি দেওয়ার আগে তিনি কখনো দেশের উন্নয়ন নিয়ে ভেবেছেন কি না।

এক পাঠক জানতে চান, দেশের উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে কেন তিনি যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংসের প্রস্তাব দিচ্ছেন। আরেকজন সংক্ষেপে প্রশ্ন করেন, তিনি দেশের উন্নয়ন সম্পর্কে আদৌ কিছু জানেন কি না।

কায়হানের সম্পাদকের প্রভাব নিয়েও ব্যঙ্গ করেছেন কয়েকজন পাঠক। তাঁদের একজন মন্তব্য করেন, দেশটির পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কায়হানের সম্পাদক কোনো মতামত দিলেই মনে হয় যেন সর্বোচ্চ নেতা নিজেই তা বলছেন।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রস্তাবের সঙ্গেও তুলনা
শরিয়তমাদারির সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে পাঠকদের কেউ কেউ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পক্ষে তাঁর আগের অবস্থানের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, আঞ্চলিক যোগাযোগ অবকাঠামোয় বাধা সৃষ্টি করার আরেকটি উদ্যোগ ইরানের জন্যই বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির উপায় হিসেবে যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহারের পক্ষে শরিয়তমাদারি আগেও বক্তব্য দিয়েছেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর তিনি ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে পারস্য উপসাগরের ফাইবার-অপটিক তারকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এ ছাড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির প্রস্তাবও এসেছে ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে। গত মে মাসে তাসনিম সংবাদ সংস্থা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট তার ব্যবহারের জন্য ফি আদায় এবং মেটা, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে ইরানের আইন মেনে কার্যক্রম পরিচালনায় বাধ্য করার প্রস্তাব দিয়েছিল।

তবে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি নিয়ে ইরানিদের প্রতিক্রিয়ায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি ইরানের নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং বিকল্প স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার চাহিদাও বাড়িয়ে দিতে পারে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল