ইরান যুদ্ধের জেরে ট্রাম্পের ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করার পাশাপাশি তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসরও সংকুচিত করছে। সাত মাসেরও বেশি সময় আগে ইরানের সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং তেহরানকে ওয়াশিংটনের দাবি মানতে বাধ্য করার লক্ষ্য নিয়ে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, তা এখন মার্কিন প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিক-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে না পারায় ট্রাম্পের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য আটলান্টিক জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে না পারায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। বিশ্বনেতা ও গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণে অভ্যস্ত ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন, যেখানে তার হুমকি ইরানকে পিছু হটাতে পারেনি। একইভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেও ওয়াশিংটন প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। সাময়িকীটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তার দাবি মেনে না নেওয়ায় ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়িয়েছে। এতে মার্কিন নাগরিকদের ওপর সংকটের ব্যয় বাড়ছে এবং নির্বাচনী পরিণতি নিয়ে রিপাবলিকানদের উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে। ফলে ইরান যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করছে।

সামরিক লক্ষ্য ও বাস্তবতার ব্যবধান
ট্রাম্পের জন্য প্রধান সমস্যা শুধু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তবে অর্জিত ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়া। যুদ্ধ শুরুর সময় ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, মার্কিন অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব ও সামরিক বাহিনীর অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা অল্প সময়ের মধ্যেই তেহরানের হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারবে। এর ফলে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার সুযোগ তৈরি হবে বলেও প্রত্যাশা করা হয়েছিল।

কিন্তু সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা মানেই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হওয়া নয়। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক সক্ষমতাকে কৌশলগত সাফল্যে রূপ দিতে অস্ত্র ও অভিযান পরিচালনার ক্ষমতার বাইরেও নানা বিষয় কাজ করে। ফলে প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ছে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক মূল্যও তত বাড়ছে।

একদিকে ট্রাম্পকে সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং দ্রুত সাফল্য অর্জনের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতিও সামাল দিতে হচ্ছে তাঁকে। ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই যুদ্ধ থেকে সরে এলে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আবার সংঘাত চালিয়ে গেলে ব্যয় ও চাপ আরও বাড়তে পারে। এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চাপ
ইরান যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের সরাসরি সংযোগ। তেল ও জ্বালানিপণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এই পথে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রত্যাশায় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ও জ্বালানির ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

দ্য আটলান্টিক-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ছয় ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবারের সরাসরি ব্যয় বাড়ায় না, পণ্য পরিবহনের খরচেও প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রে ভোগ্যপণ্যের একটি বড় অংশ ট্রাকে করে পরিবহন করা হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের খুচরা মূল্যেও পড়তে পারে।

এভাবে বিদেশের একটি সামরিক সংঘাত ধীরে ধীরে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। জ্বালানির বাড়তি ব্যয় পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উভয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতি শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এমন পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সাধারণত ভোটাররা অর্থনৈতিক ব্যয়ের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারের কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাই জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে এবং পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়লে সরকারের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ অবস্থায় সামরিক সাফল্যের দাবি করলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিজনিত অসন্তোষ পুরোপুরি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে রিপাবলিকানদের উদ্বেগ

দ্য আটলান্টিক-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে বলে উদ্বিগ্ন রিপাবলিকানরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে দলটির নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের গঠন বদলে গেলে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসের ওপর রাজনৈতিক চাপ ও তদারকি বাড়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। এ কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা রিপাবলিকানদের কাছে শুধু জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্ন নয়, বরং নির্বাচনী রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।

এখানেই ট্রাম্পের সামনে একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য এবং প্রতিপক্ষের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা তুলে ধরতে চান। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ব্যয় যখন নাগরিকদের ওপর গিয়ে পড়ছে, তখন সেই ভাবমূর্তিই চাপে পড়তে পারে। সংকট যত দীর্ঘ হবে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা এবং এর ব্যয় বহনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করাও তত কঠিন হতে পারে।

দায় এড়াতে ইউক্রেনকে সামনে আনছেন ট্রাম্প?

প্রতিবেদনের আরেক অংশে দ্য আটলান্টিক জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী কাউকে খুঁজছেন ট্রাম্প। সংকটের কিছু সমস্যার জন্য তিনি ইউক্রেনকে দায়ী করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার হুমকির মুখে থাকা একটি দেশের ওপর বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধির দায় চাপানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত থেকে জনমতের মনোযোগ সরিয়ে নিতে ইউক্রেনকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। তবে বৈশ্বিক তেলের দাম কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করে সরবরাহ, চাহিদা, বাজারের প্রত্যাশা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ একাধিক বিষয়ের ওপর। জ্বালানির বাজারে সব ধরনের ওঠানামার জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না।

এ ক্ষেত্রে প্রতিবেদনের মূল প্রশ্ন হলো, নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতির মুখে ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন এবং সেই দায় অন্যদের ওপর সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন কি না। ইউক্রেনকে দায়ী করার বিষয়টি প্রতিবেদনে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে বিতর্কের ইঙ্গিত দেয়।

সব মিলিয়ে, দ্য আটলান্টিক-এর বিশ্লেষণে ইরান যুদ্ধকে ট্রাম্পের জন্য একটি কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি একাই এই সংকট থেকে সহজে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করতে পারেনি। রাজনৈতিক বিকল্প সংকুচিত হওয়া, অর্থনৈতিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ, সবকিছুই ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরকে সীমিত করছে।

এখন ওয়াশিংটনের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু ইরানের সঙ্গে সংঘাত কীভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা নয়; বরং বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য না দিয়ে কীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটানো যায়, সেই পথ খুঁজে বের করাও। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, দ্রুত সাফল্য অর্জনের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির ব্যবধান তত স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত