সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব সক্ষমতা কাজে লাগাবে ইরান: বাঘাই

যেকোনো ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরান তার সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেছেন, বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিন দফা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষার অভিজ্ঞতা ইরানের সামরিক প্রস্তুতি ও যেকোনো হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

তিউনিসিয়ার সংবাদমাধ্যম আশ-শুরুককে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাঘাই আঞ্চলিক পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা এবং বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপমুক্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি স্পষ্ট করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করতে তেহরান তার হাতে থাকা সব সক্ষমতা ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় ইরান-ওমানের দায়িত্ব

হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, কৌশলগত এই জলপথের উপকূলবর্তী দুই দেশ হিসেবে ইরান ও ওমানের নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। কয়েক দশক ধরেই ইরান এ অঞ্চলে সামুদ্রিক যান চলাচলের নিরাপত্তাকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে আসছে বলে জানান তিনি।

তবে বাঘাইর অভিযোগ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূখণ্ড ও স্থাপনাগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব হামলায় আবাসিক এলাকাও আক্রান্ত হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা ও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নির্ধারণের সময় এসব ঘটনা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, এই জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

বাঘাই জানান, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের পথ নির্ধারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরান ও মাস্কাটের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। দুই দেশ একটি অস্থায়ী নিরাপদ নৌপথ নিয়ে সমঝোতায়ও পৌঁছেছে। তবে সেটি বাস্তবায়নের কিছু খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের মধ্যকার এই সমঝোতাকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া কিংবা প্রণালিটির সামগ্রিক অবস্থার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জলপথটির পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ইরান ও ওমানের অংশগ্রহণ এবং সম্মতি অপরিহার্য।

বাঘাই আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ যেন এ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।
বিদেশি সামরিক উপস্থিতির বাইরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার আহ্বান

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে বাঘাই বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রতিবেশী দেশগুলো এবং পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করেছে।

তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদেরই নেওয়া উচিত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি সামরিক শক্তির উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক অনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে।

বাঘাই বলেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তাকে সম্মান করে এবং তাদের প্রতি ইরানের কোনো শত্রুতা নেই। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং নিজস্ব উদ্যোগে নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ইরানের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের নীতি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে অঞ্চলের বাইরের শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ ছাড়াই দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাঘাই স্বীকার করেন, এ ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা রাতারাতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তবে ধারাবাহিক সংলাপ এবং দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতার দিকে অগ্রসর হওয়াকে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে ইরানের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জোটের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, আগ্রাসন ও হুমকির মুখে নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় ইরান বরাবরই দৃঢ়তা ও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।

তিনি বলেন, যেকোনো বৈরী পদক্ষেপ মোকাবিলায় ইরান তার হাতে থাকা সব সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিন দফা প্রতিরক্ষার অভিজ্ঞতা দেশটির কার্যকর প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বাঘাইর বক্তব্যে একদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি উঠে এসেছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বাইরের সামরিক শক্তির ভূমিকা কমিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো নতুন আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরানের সর্বাত্মক প্রস্তুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। সূত্র: ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি