'প্রজন্মের পর প্রজন্ম গাজায় পরিবেশ ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত বয়ে বেড়াবে'

গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞের পরিবেশগত ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে বেড়াতে হবে বলে সতর্ক করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, গাজার মাটি ও প্রতিবেশব্যবস্থার যে বিপর্যয় ঘটেছে, তার ভয়াবহ প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। যুদ্ধের এই পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞকে ‘ইকোসাইড’ বা প্রকৃতির বিরুদ্ধে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে এর আন্তর্জাতিক নিন্দা জানান তিনি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশন অব পার্টিজের ১৭তম সম্মেলনে (কপ-১৭) বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, যুদ্ধের ক্ষতি শুধু মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপরও। গাজার পরিস্থিতি সেই বিপর্যয়েরই একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

পেজেশকিয়ানের মতে, যুদ্ধের কারণে মাটি ও পানি দূষিত হয়, বনভূমি পুড়ে যায়, জলাভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যায়। সামরিক সংঘাতের সময় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া দূষণকারী পদার্থ ও ভারী ধাতু প্রাকৃতিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও এসব ক্ষতির প্রভাব বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ তুলে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘গাজা প্রকৃতির বিরুদ্ধে গণহত্যার এক স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। সেখানকার ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকবে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিবেশগত এই বিপর্যয়কে শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবেশের ক্ষতি রাজনৈতিক সীমান্ত অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে, তাই এর মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন ও যুদ্ধংদেহী কর্মকাণ্ডে আঞ্চলিক প্রতিবেশব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিনা উসকানির আগ্রাসী যুদ্ধও এ অঞ্চলের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সামরিক অভিযানে শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনার ক্ষতি, অগ্নিকাণ্ড এবং দূষণসহ নানা ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রকৃতিকে যুদ্ধের নীরব ও আত্মরক্ষায় অক্ষম শিকারে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবেশব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং আক্রান্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সংস্থা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

পেজেশকিয়ানের মতে, সামরিক সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া জরুরি। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক আগ্রাসনের শিকার দেশগুলোর ওপর এসব সংকটের পুরো আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। যেসব যুদ্ধ তারা শুরু করেনি, সেসব যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতির দায়ও তাদের এককভাবে বহন করতে বাধ্য করা অন্যায্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তিতে ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিনিময় এবং দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক লক্ষ্যগুলো কেবল ঘোষণা ও আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, পানির সংকট ও মরুকরণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেক উন্নয়নশীল দেশ এমনিতেই সমস্যার মুখে রয়েছে। এর সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থ ও প্রযুক্তির সীমিত সুযোগ যুক্ত হলে পরিবেশ সংরক্ষণের কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

বক্তব্যে ইরানের বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সম্পদের কথাও তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, হিরকানিয়া ও আরাসবারানের বনভূমি, জাগরোস পর্বতমালা, মরুভূমি এবং পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত ইরানের প্রতিবেশব্যবস্থা দেশটির প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এসব প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

তিনি জানান, ইরান ইতোমধ্যে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে এ কার্যক্রমের জাতীয় সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। বিপন্ন প্রজাতির সুরক্ষা, সংরক্ষিত এলাকার বিস্তার, গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির ওপর নজরদারি এবং বন্য প্রাণীর পুনর্বাসনকেন্দ্র গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

পেজেশকিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানে সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ ২৮ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ২৫টি মেরুদণ্ডী প্রাণীর প্রজাতির জন্য কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এশীয় চিতা ও পারস্য পতিত হরিণের মতো প্রজাতি সংরক্ষণেও জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ কর্মদল গঠন করা হয়েছে।

পেজেশকিয়ান জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, নিরাপত্তা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, পানির সংকট ও প্রতিবেশব্যবস্থার অবক্ষয়ে জর্জরিত অঞ্চলে পরিবেশগত সহযোগিতা দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমাতে পারে। প্রকৃতি রক্ষায় যৌথ উদ্যোগ পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম করতে পারে।

বক্তব্যের শেষাংশে পেজেশকিয়ান জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক দক্ষতা, শিক্ষাগত সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য ইরানের প্রস্তুতির কথা জানান। তাঁর মতে, প্রকৃতির সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা গেলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি