ইয়েমেনের সংঘাতে ইরান নিজেই একটি পক্ষ, এমন অভিযোগ তুলে দেশটিতে মধ্যস্থতার জন্য তেহরানের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবা। তাঁর বক্তব্য, হুথিদের অস্ত্র সরবরাহকারী কোনো পক্ষ একই সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে না। ইয়েমেনের সংঘাতে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের অভিযোগ তুলে তিনি দেশটিতে তেহরানের প্রভাব ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে আল-জুবা বলেন, যারা যুদ্ধের একটি পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করেন, তাঁরা সেই যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী হতে পারেন না। তাঁর অভিযোগ, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান সরবরাহের মাধ্যমে ইরান নিজেকে ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের একটি পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়ার পরিবর্তে তেহরানের উচিত ইয়েমেন থেকে নিজেদের প্রভাব ও অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া, অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এবং আন্তর্জাতিক আইন ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের নীতি মেনে চলা।
সংঘাত দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ
হুথিদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখে ইরান ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘায়িত করছে বলে অভিযোগ করেন আল-জুবা। তাঁর দাবি, তেহরান যখন মধ্যস্থতার কথা বলছে, তখন ইয়েমেনের মাটিতে সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে।
তিনি বলেন, হুথিরা অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে হামলা জোরদার করছে, তাইজ শহর অবরোধ করে রেখেছে, ইয়েমেনের ভেতরে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে এবং সৌদি আরবের ওপর হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আল-জুবার মতে, হুথিরা রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা বারবার প্রত্যাখ্যান করলেও ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাব সেই বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনকে আবারও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পথে ফিরিয়ে আনা।
ইয়েমেনের এই মন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, উত্তেজনা প্রশমনের সময়গুলোকে হুথিরা নিজেদের পুনর্গঠন এবং সামরিক অস্ত্রভাণ্ডার শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করেছে। তাঁর ভাষায়, আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরান ইয়েমেনকে দর-কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
ইয়েমেনের প্রতিনিধিত্বের অধিকার নিয়ে আপত্তি
হুথিদের ইয়েমেন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার যেকোনো প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করেছেন আল-জুবা। একই সঙ্গে ইয়েমেনের চলমান সংঘাতকে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার বিরোধ হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন তিনি।
আল-জুবার বক্তব্য, অভ্যুত্থানকারী গোষ্ঠী হিসেবে তিনি যাদের বর্ণনা করেছেন, সেই হুথিদের সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগ তাদের ইয়েমেনের বৈধ প্রতিনিধি হওয়ার অধিকার দেয় না। একইভাবে, ইয়েমেনের জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইরানকেও কোনো কর্তৃত্ব দেয় না।
তিনি বলেন, হুথিরা নিজেদের সিদ্ধান্তের জন্য নিজেরাই দায়ী। তবে গোষ্ঠীটিকে সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দেওয়ার কারণে ইরানও সেই সহায়তার পরিণতি এড়িয়ে যেতে পারে না। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত একটি গোষ্ঠীর মূল্যায়নের ওপর ইয়েমেন ও পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা নির্ভর করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন
সৌদি আরবের প্রতি ইয়েমেনের সংহতি পুনর্ব্যক্ত করে আল-জুবা বলেন, নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় সৌদি আরবের অধিকারের প্রতি তাঁর দেশের সমর্থন রয়েছে।
তিনি দুই দেশের নিরাপত্তাকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, অর্থনৈতিক, মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে সৌদি আরব ইয়েমেনের রাষ্ট্র ও জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে, ইরান হুথিদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্যদেশগুলো এবং জর্ডানের মুখোমুখি হওয়া হামলা ও হুমকিগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখেন না আল-জুবা। তাঁর দাবি, এসব ঘটনা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও অর্থায়নের মাধ্যমে সহায়তা করার ইরানি নীতির অংশ।
ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর বিষয়ে ইরানের আহ্বানের জবাবে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কয়েকটি অভিযোগ তুলে ধরেন আল-জুবা। তিনি অভিযোগ করেন, তেহরানে হুথিদের একজন প্রতিনিধিকে গ্রহণ করে তাঁকে ইয়েমেনের কূটনৈতিক কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া সানায় হুথিদের কাছে ইরানের প্রতিনিধি নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুমোদন ছাড়াই সানা বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।
আল-জুবার মতে, এসব পদক্ষেপ ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদেরও পরিপন্থী।
ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান
ইয়েমেনে ইরানের হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আল-জুবা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধার এবং ইয়েমেনের পুরো ভূখণ্ডে সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দেশটির সরকারকে সহায়তা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
হুথিদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা, তাদের অর্থায়নের উৎস বন্ধ করা, সমর্থকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী গোষ্ঠীটির ওপর আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়ন আরও কঠোর করারও আহ্বান জানান ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে হুথিদের কাছে অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ করতে হবে। তাঁর ভাষায়, যারা ইয়েমেনে শান্তি চান, তাঁদের শুরু করতে হবে সেই অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ করার মধ্য দিয়ে, যেসব অস্ত্র দিয়ে ইয়েমেনিদের হত্যা করা হচ্ছে। সূত্র: আরব নিউজ